Ad space

হামদর্দকে নতুন উচ্চতায় নিতে চাই: অধ্যাপক কামরুন নাহার হারুন

প্রকাশ:
9

বাংলাদেশে ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা এবং ভেষজ ওষুধ শিল্পের ইতিহাসে হামদর্দ একটি সুপরিচিত ও আস্থার নাম। প্রায় সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটি শুধু ওষুধ উৎপাদনই করেনি, বরং স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, গবেষণা ও মানবকল্যাণমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছে। সম্প্রতি হামদর্দ বাংলাদেশের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন অধ্যাপক কামরুন নাহার হারুন। এর আগে তিনি প্রতিষ্ঠানটির বিক্রয় ও বিপণন বিভাগ এবং পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের সিনিয়র পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একই সঙ্গে তিনি হামদর্দ পাবলিক কলেজের চেয়ারম্যান এবং হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বাংলাদেশে আধুনিক হামদর্দের রূপকার ড. হাকীম মো. ইউছুফ হারুন ভূঁইয়ার সহধর্মিণী হলেও, দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি নিজস্ব পরিচয় গড়ে তুলেছেন একজন শিক্ষাবিদ, গবেষক, লেখক ও প্রশাসক হিসেবে। ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন, গবেষণা এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে তার অবদানও উল্লেখযোগ্য।

সম্প্রতি মানবজমিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি হামদর্দের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, ইউনানী-আয়ুর্বেদিক খাতের সম্ভাবনা, শিক্ষা ও গবেষণার বিস্তার এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন।

নতুন দায়িত্ব গ্রহণের অনুভূতি জানাতে গিয়ে কামরুন নাহার বলেন, এই পদ তার জন্য সম্মানের হলেও এর সঙ্গে দায়িত্বও বহুগুণ বেড়ে গেছে। তিনি মনে করেন, দায়িত্ব মানে শুধু প্রশাসনিক ক্ষমতা নয়; বরং প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা। তিনি বলেন, হামদর্দ পরিবারের প্রতিটি সদস্যের সুখ-দুঃখের অংশীদার হয়ে কাজ করতে চান এবং প্রতিষ্ঠানের কল্যাণে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনাই হবে তার প্রধান লক্ষ্য।

তার ভাষায়, হামদর্দের দর্শন কেবল ব্যবসা নয়, মানবকল্যাণ। সেই দর্শনকে আরও বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে দিতে তিনি কাজ করে যেতে চান।

হামদর্দের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি জানান, এটি একটি কল্যাণমুখী ওয়াকফ প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির আয় ও লভ্যাংশের বড় অংশ স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, গবেষণা এবং মানবকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করা হয়। হামদর্দ ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকা- পরিচালিত হচ্ছে। ফলে প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক পরিসর যত বাড়বে, সমাজের জন্য অবদান রাখার সুযোগও তত বৃদ্ধি পাবে।

তিনি স্মরণ করেন, একসময় হামদর্দ ছিল একটি দায়দেনায় জর্জরিত ও প্রায় দেউলিয়া প্রতিষ্ঠান। সেই কঠিন সময় থেকে ড. ইউছুফ হারুন ভূঁইয়ার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি ধাপে ধাপে ঘুরে দাঁড়ায়। তার মতে, নিষ্ঠা, সততা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং আত্মনিবেদিত নেতৃত্ব থাকলে যে কোনো প্রতিষ্ঠান নতুন করে উঠে দাঁড়াতে পারে। সেই অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখেই তিনি হামদর্দকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে চান।

কামরুন নাহার জানান, দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও হামদর্দের উপস্থিতি আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ঐতিহ্যবাহী পানীয় রুহ আফজার পাশাপাশি বর্তমানে আমরূপালি ফ্রুট সিরাপও মানুষের আস্থা অর্জন করেছে। আসল আমের পাল্প দিয়ে তৈরি এই পণ্যটি সারা বছর আমের স্বাদ উপভোগের সুযোগ তৈরি করেছে। তিনি মনে করেন, দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে মানসম্মত ও নির্ভেজাল পণ্য উৎপাদনই হামদর্দের সবচেয়ে বড় শক্তি।

Image

তার মতে, শুধু ভেষজ ওষুধ নয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে হামদর্দের সামনে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে। এসব উদ্যোগ ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানটির বাজার সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

হামদর্দের সাফল্যের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে এটি দেশের অন্যতম সফল ওয়াকফ প্রতিষ্ঠান। অথচ একই সময়ে অনেক ওয়াকফ প্রতিষ্ঠান বিপুল সম্পদ থাকা সত্ত্বেও দুর্বল হয়ে পড়েছে। হামদর্দের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে।

তিনি এই সাফল্যের পুরো কৃতিত্ব দেন ড. হাকীম মো. ইউছুফ হারুন ভূঁইয়ার দীর্ঘদিনের আত্মত্যাগ, নেতৃত্ব এবং দূরদর্শিতাকে। তার মতে, একটি প্রতিষ্ঠানের নাম ছাড়া যখন আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না, তখন সেই নামকে পুঁজি করেই নতুন করে যাত্রা শুরু করেছিলেন তিনি। সীমাহীন প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি হাল ছাড়েননি। সততা, আন্তরিকতা এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে একটি প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানকে দেশের শীর্ষ পর্যায়ে নিয়ে আসা সহজ কাজ ছিল না।

কামরুন নাহারের মতে, হামদর্দের বর্তমান অবস্থান প্রমাণ করে যে দক্ষ নেতৃত্ব এবং সৎ উদ্দেশ্য থাকলে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়।

শিক্ষাবিদ হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, হামদর্দে যোগ দেওয়ার আগে তিনি দীর্ঘদিন অধ্যাপনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক বিষয়ে তার লেখা বই বর্তমানে শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক খাতের উন্নয়নে এখনও অনেক কাজ করার সুযোগ রয়েছে। সরকারি ইউনানী-আয়ুর্বেদিক ডিগ্রি কলেজ প্রতিষ্ঠায় ড. ইউছুফ হারুন ভূঁইয়ার অগ্রণী ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে যে কয়েকটি ডিগ্রি পর্যায়ের প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তার বেশিরভাগই হামদর্দ প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করছে।

Image

নতুন দায়িত্বে থেকে তিনি এই খাতের প্রয়োজনীয় সংস্কার, শিক্ষা ও গবেষণার প্রসার এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির কাজকে আরও গতিশীল করতে চান। তার মতে, দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য মানসম্মত শিক্ষা এবং উন্নতমানের ওষুধ উৎপাদন-দুটিকেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

হামদর্দ পাবলিক কলেজ এবং হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয় নিয়েও রয়েছে তার বিস্তৃত পরিকল্পনা। তিনি বলেন, এই দুই প্রতিষ্ঠানের মূল স্বপ্নদ্রষ্টা ড. ইউছুফ হারুন ভূঁইয়া এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, যেখানে শিক্ষার্থীরা শুধু পরীক্ষাভিত্তিক প্রস্তুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং জ্ঞান, গবেষণা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে নিজেদের গড়ে তুলবে।

তিনি জানান, সম্মিলিত প্রচেষ্টায় হামদর্দ পাবলিক কলেজ ইতোমধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করেছে। অন্যদিকে হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব সবুজ ও মনোরম ক্যাম্পাসে শিক্ষার মান উন্নয়নে ধারাবাহিকভাবে কাজ চলছে। প্রচলিত বিভাগের পাশাপাশি আধুনিক ও সময়োপযোগী নতুন বিভাগ চালু হয়েছে। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের কনভোকেশনও সফলভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা প্রতিষ্ঠানটির বিকাশের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

তার মতে, অল্প সময়ের মধ্যেই হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব ক্যাম্পাস, শিক্ষার পরিবেশ এবং একাডেমিক মানের কারণে দেশের উচ্চশিক্ষা অঙ্গনে একটি ইতিবাচক অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির প্রসঙ্গেও আশাবাদী কামরুন নাহার। তার নেতৃত্বে ২০২৬ সালে হামদর্দ সিঙ্গাপুরভিত্তিক হেল্থকেয়ার এশিয়া ফার্মা অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেছে। তিনি মনে করেন, এই পুরস্কার কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্য নয়; বরং বাংলাদেশের ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক শিল্পের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।

এই অর্জনের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, কাজই মানুষকে স্বীকৃতি এনে দেয়। ড. ইউছুফ হারুন ভূঁইয়া সবসময় বলেন, আন্তরিকভাবে কাজ করলে তার প্রতিদান একদিন না একদিন অবশ্যই পাওয়া যায়। হামদর্দের ক্ষেত্রেও সেটিই ঘটেছে। দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা, পরিশ্রম, গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল হিসেবেই আন্তর্জাতিক এই স্বীকৃতি এসেছে।

তিনি বলেন, এই পুরস্কারের অংশীদার হামদর্দের প্রতিটি কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং সহযোগী। তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলেই প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে সক্ষম হয়েছে।

কামরুন নাহার মনে করেন, ভবিষ্যতের হামদর্দ শুধু একটি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি হবে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, গবেষণা, শিল্প এবং মানবকল্যাণকে একসঙ্গে ধারণ করা একটি আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠান। দেশের ভেষজ শিল্পকে আরও সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, গবেষণা সম্প্রসারণ এবং নতুন প্রজন্মের জন্য টেকসই প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলাই হবে তার অগ্রাধিকার।

তার প্রত্যাশা, হামদর্দ এমন একটি মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে, যা শুধু ইউনানী-আয়ুর্বেদিক খাতের জন্য নয়, দেশের শিল্প, সামাজিক উদ্যোগ এবং ওয়াকফ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও অনুসরণযোগ্য উদাহরণ হয়ে থাকবে। সেই লক্ষ্যেই তিনি হামদর্দকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।

আরও পড়ুন

লোড হচ্ছে...