Ad space

ব্যাংকের মূল শক্তি হলো জনগণের আমানত

প্রকাশ:
20
Image

বাংলাদেশের ব্যাংক খাত যখন দীর্ঘদিন ধরে আস্থার সংকট, খেলাপি ঋণের চাপ, তারল্য সংকট এবং সুশাসনের প্রশ্নে আলোচিত, ঠিক সেই সময় দেশের চতুর্থ প্রজন্মের একটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন উজমা চৌধুরী। ২০২৫ সালের মার্চে তিনি মেঘনা ব্যাংক পিএলসি-এর চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। একই সঙ্গে তিনি দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ-এর ফাইন্যান্স ডিরেক্টর হিসেবেও দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে সার্টিফায়েড পাবলিক অ্যাকাউন্ট্যান্ট হিসেবে নিবন্ধিত এই পেশাজীবীর বক্তব্যে একদিকে যেমন ব্যাংকিং খাতের বাস্তবতা উঠে আসে, অন্যদিকে দেশের শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামগ্রিক অর্থনীতির প্রতি একটি দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গিও স্পষ্ট হয়।

মেঘনা ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই তিনি বারবার একটি বিষয়কে সামনে এনেছেন-ব্যাংকের মূল শক্তি হলো জনগণের আমানত এবং সেই আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই ব্যাংকারদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যেভাবে বিভিন্ন অনিয়ম, ঋণ কেলেঙ্কারি ও পরিচালন দুর্বলতার ঘটনা সামনে এসেছে, সেখানে উজমা চৌধুরীর এই বক্তব্য অনেকটাই তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি মনে করেন, ব্যাংক পরিচালনার ক্ষেত্রে দ্রুত বড় হওয়ার চেয়ে স্থিতিশীলতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই তিনি “স্লো অ্যান্ড স্টেডি” পদ্ধতির ওপর জোর দেন।

তার ভাষায়, অনেক ব্যাংক দ্রুত সম্প্রসারণের চেষ্টা করতে গিয়ে বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। কিন্তু মেঘনা ব্যাংক তুলনামূলক রক্ষণশীল নীতি অনুসরণ করায় এখনো স্থিতিশীল অবস্থানে রয়েছে। তিনি এটাও স্বীকার করেন যে শুরুতে সব সিদ্ধান্ত শতভাগ সঠিক ছিল না, তবে ভুল থেকে শিক্ষা নেয়ার মধ্য দিয়েই প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিতে হয়েছে। এই আত্মসমালোচনামূলক অবস্থান বাংলাদেশের করপোরেট ও ব্যাংকিং খাতে খুব বেশি দেখা যায় না।

উজমা চৌধুরীর বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি উঠে আসে, তা হলো সুশাসন। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি প্রথম কয়েক মাস ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা বোঝার চেষ্টা করেছেন এবং এরপর ঋণ বিতরণে নিরাপত্তা ও কমপ্লায়েন্স জোরদারের দিকে মনোযোগ দিয়েছেন। তার মতে, বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের বড় দুর্বলতার একটি হলো নথিপত্র ও মর্টগেজ ব্যবস্থার জটিলতা। জমির মালিকানা, দলিল এবং নিরাপত্তা যাচাইয়ের দুর্বলতা অনেক সময় খেলাপি ঋণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এ কারণেই তিনি শতভাগ কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করার কথা বলছেন।

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে বর্তমানে খেলাপি ঋণ একটি বড় সংকট। সরকারি হিসাবে খেলাপি ঋণের হার একরকম দেখানো হলেও বাস্তবে এর পরিমাণ আরও অনেক বেশি বলে অর্থনীতিবিদদের ধারণা। সেই জায়গা থেকে মেঘনা ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৫ দশমিক ৭ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকার বিষয়টি তিনি একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে তুলে ধরেছেন। তবে এটিকে তিনি চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে দেখেন না। বরং তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং বিনিয়োগের স্থবিরতা ব্যাংকগুলোর ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

এখানেই তার বিশ্লেষণ শুধু ব্যাংকিংয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং দেশের শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের বৃহত্তর বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, ব্যবসায়ীরা ভালো থাকলে ব্যাংকও ভালো থাকবে। অর্থাৎ ব্যাংকিং খাতকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। শিল্পে উৎপাদন বাড়বে, রফতানি বাড়বে, বিনিয়োগ বাড়বে-তখনই ব্যাংকের ঋণ আদায় ও মুনাফা বাড়বে।

বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের চাপের প্রসঙ্গ তিনি উল্লেখ করেছেন। বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হওয়া সত্ত্বেও গার্মেন্টস খাত বর্তমানে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তার মুখে রয়েছে। উজমা চৌধুরী মনে করেন, রফতানি খাত ভালো না করলে ব্যাংক খাতও চাপে পড়ে যাবে। কারণ রফতানি আয় কমে গেলে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট তৈরি হয়, টাকার ওপর চাপ বাড়ে এবং মূল্যস্ফীতিও বাড়তে থাকে।

তার বিশ্লেষণে রেমিট্যান্সের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তিনি বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহের উচ্চ প্রবৃদ্ধির কারণে ডলারের বাজার কিছুটা স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু এই স্থিতিশীলতা নষ্ট হলে টাকার অবমূল্যায়ন আরও বাড়বে। এতে মূল্যস্ফীতি নতুন করে চাপ সৃষ্টি করবে এবং শিল্প খাতের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়বে। অর্থাৎ ব্যাংকিং, রেমিট্যান্স, রফতানি ও শিল্প সবকিছুই পরস্পরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত বলে তিনি মনে করেন।

Image

তবে এই কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও তিনি আশাবাদী। তার বক্তব্যে বারবার “ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড” বা জনমিতিক সুবিধার কথা এসেছে। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা গেলে দেশের অর্থনীতি আরও বড় প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারবে। তার পর্যবেক্ষণ হলো, শিক্ষার গুণগত মান হয়তো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি, কিন্তু শিক্ষার হার বেড়েছে এবং মানুষের জীবনযাত্রার মানও উন্নত হয়েছে। এই পরিবর্তনকে তিনি ভবিষ্যতের সম্ভাবনা হিসেবে দেখেন।

উজমা চৌধুরীর বক্তব্যে একটি বাস্তববাদী অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিও দেখা যায়। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে অতিরিক্ত হতাশ হওয়ার কারণ নেই। কারণ গত দুই দশকে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি, নারীর অংশগ্রহণ এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সংস্কৃতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। তিনি বলেছেন, গ্রামের নারীরাও এখন আর শুধু গৃহস্থালির কাজে সীমাবদ্ধ নেই; তারা কৃষিকাজ, গবাদিপশু পালন, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং অনলাইনভিত্তিক উদ্যোক্তা কর্মকা-ে যুক্ত হচ্ছেন। এই পরিবর্তনকে তিনি দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক সামাজিক শক্তি হিসেবে দেখেন।

একইভাবে তরুণদের মধ্যেও তিনি নতুন সম্ভাবনা দেখছেন। অনেক শিক্ষার্থী এখন লেখাপড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের আয়মুখী কাজে যুক্ত হচ্ছে। কেউ টিউশনি করছে, কেউ অনলাইনে ক্ষুদ্র ব্যবসা করছে, আবার কেউ ডিজিটাল সেবাভিত্তিক কাজ করছে। তার মতে, এই পরিবর্তনগুলো প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের মানুষ সুযোগ পেলে কাজ করতে চায় এবং নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পারে।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা খাত নিয়েও তার বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সিএমএসএমই খাতের অবদান ক্রমেই বাড়ছে। কিন্তু এ খাতে ঋণ বিতরণ এখনো ব্যাংকগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ। কারণ ছোট উদ্যোক্তাদের নথিপত্র, ট্রেড লাইসেন্স ও নিরাপত্তা যাচাইয়ে সময় ও ব্যয় বেশি হয়। উজমা চৌধুরী মনে করেন, আইন-শৃঙ্খলা ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ উন্নত করা গেলে আরও বেশি মানুষ উদ্যোক্তা হতে আগ্রহী হবে।

তার মতে, বর্তমানে বাংলাদেশের অনেক তরুণ উদ্যোক্তা মূলধনের চেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন নীতিগত জটিলতা ও প্রশাসনিক বাধার কারণে। ছোট ব্যবসা শুরু করতে গিয়ে বিভিন্ন অনুমোদন, লাইসেন্স এবং অনানুষ্ঠানিক খরচ উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করে। ফলে অর্থনীতির যে স্বাভাবিক উদ্যোক্তা প্রবাহ তৈরি হওয়ার কথা, তা অনেক ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত হয়। এই জায়গায় সরকার ও নীতিনির্ধারকদের আরও কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

পুঁজিবাজার নিয়েও তার বক্তব্য বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, ব্যাংক খাতে সংস্কারের কিছু উদ্যোগ দেখা গেলেও পুঁজিবাজারে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি। দীর্ঘদিনের অনিয়ম, আস্থাহীনতা ও নীতিগত দুর্বলতার কারণে দেশের পুঁজিবাজার এখনো অস্থির। মেঘনা ব্যাংক নিজেও এখনো শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়নি। তবে পরিস্থিতির উন্নতি হলে ব্যাংকটি পুঁজিবাজারে আসবে বলে তিনি জানিয়েছেন।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-উজমা চৌধুরীর বক্তব্যে অতিরঞ্জিত আশাবাদ যেমন নেই, তেমনি হতাশাও নেই। বরং তিনি বাস্তবতাকে স্বীকার করে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলছেন। বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলারের চাপ, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং জ্বালানি সংকট। কিন্তু তিনি মনে করেন, অর্থনীতির গ্রাফ সবসময় একইরকম থাকে না; ওঠানামা থাকবে, তবে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল নীতি ও সুশাসন থাকলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।

নির্বাচিত সরকারের প্রতি তার প্রত্যাশাও মূলত ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরিকে কেন্দ্র করে। তিনি চান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শুরু হওয়া শুদ্ধি অভিযান অব্যাহত থাকুক। কারণ ব্যাংক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত এবং জবাবদিহিমূলক আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে শিল্প ও ব্যবসা খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হলে নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

মেঘনা ব্যাংকের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রসঙ্গে তিনি করপোরেট ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি এসএমই, হোম লোন ও কার্ড লোনের মতো খাতে বৈচিত্র্য আনার কথা বলেছেন। এটি আসলে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের পরিবর্তিত বাস্তবতার প্রতিফলন। কারণ শুধু বড় করপোরেট ঋণের ওপর নির্ভরশীল ব্যাংকিং মডেল এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। বরং খুচরা ও বহুমুখী ঋণ কাঠামো ব্যাংককে দীর্ঘমেয়াদে বেশি স্থিতিশীলতা দিতে পারে।

সব মিলিয়ে উজমা চৌধুরী-এর বক্তব্যে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাতের একটি বাস্তব চিত্র উঠে আসে। সেখানে যেমন সংকট আছে, তেমনি সম্ভাবনাও আছে। তিনি দ্রুত সাফল্যের চেয়ে স্থিতিশীলতাকে গুরুত্ব দেন, বড় বড় প্রতিশ্রুতির চেয়ে সুশাসনের কথা বলেন, আর অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি শক্তি হিসেবে দেখেন দেশের সাধারণ মানুষ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও তরুণ জনগোষ্ঠীকে। বাংলাদেশের বর্তমান আর্থিক বাস্তবতায় এই দৃষ্টিভঙ্গি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।

আরও পড়ুন

লোড হচ্ছে...