Ad space

ছোটকাকু সিরিজ ভুলতে ভুলতে ভোলাতে

প্রকাশ:
48
Image

ছোটকাকু সিরিজ

ভুলতে ভুলতে ভোলাতে

ফরিদুর রেজা সাগর

ছোটকাকু বললেন, ডিলা গ্রান্ডে মেফিস্টো ফিলিপস ইয়াক ইয়াক। কার ডায়লগ বলতো।

সীমান্ত হাত তুলল, টেনি দা, টেনি দা।

কান ধরে তোকে কানপুরে পাঠাবো এটা কার?

টেনিদার।

মেকুর হৈক্কর খাই হুড়–ম করছে।

না কাকু ঠিক হলো না। মেকুর হুড়–ম খাইয়া হৈক্কর করছে। সীমান্ত বলল এটাও টেনিদারই ডায়লগ।

তোর তো দেখি একেবারে মুখস্থ টেনিদা। বললেন, ছোটকাকু।

হাঁ কাকু মজার না ব্যাপারটা।

অর্শা বলল, আমার ফেলুদাকেও খুব ভালো লাগে।

ছোটকাকু বললেন, কি যে বলিস এরা তো সব আমার নমস্য। মাথার ওপর দাঁড়িয়ে আছেন।

শরিফ সিঙ্গাপুরি বললেন, ছোটকাকু আপনিও কম যাচ্ছেন না। ফেলুদার পাশাপাশি আপনিও একটু দাঁড়িয়ে গেছেন।

এই কথা শুনে ছোটকাকু লজ্জায় মাথা নিচু করে হাসলেন।

কি বলেন, শরিফ সাহেব। কোথায় আগরতলা আর কোথায় চকির তলা। বলে চারজনই হাসতে লাগলেন।

তারা বসেছে একটি চাইনিজ রেস্টুরেন্টে। ছোটকাকুর খুব প্রিয় মাশরুম স্যুপ, তিনি খাচ্ছেন। অর্শা সীমান্ত নিয়েছে থাই স্যুপ। শরিফ সিঙ্গাপুরি কোনো স্যুপ খান না কারণ সিঙ্গাপুরের নামে কোনো স্যুপ নাই। স্যুপ কোনো কাপে দেয়া হয় না। বাটিতে দেয়া হয়। কাপে দিলে সমস্যা কি?

এর হঠাৎ অর্শা বলল, ছোটকাকু তুমি তো কয়েকদিন ফ্রি আছ, চলো আমরা বাংলার ভেনিস থেকে ঘুরে আসি। শুধু ঘোরার জন্য যাবো।

বাংলার ভেনিস মানে বরিশাল?

জ্বি ছোটকাকু।

শরিফ সিঙ্গাপুরি লাফিয়ে উঠলেন। আমি কখনো এই শহরে যাইনি। চলো চলো আমরা যাই।

ছোটকাকু বললেন, সবকিছু করবে অর্শা। আমরা একদিন সবাই রওনা দিয়ে দিবো বরিশালের উদ্দেশে এবং অবশ্যই সেটা হবে জলপথে। আজকাল ঢাকা বরিশাল রুটে অনেক বড় বড় লঞ্চ, স্টিমার আছে। একটি আনন্দময় জার্নি হবে আশা করি। বিশাল বিশাল লঞ্চের আধুনিক সব কেবিন। সব রকমের সুবিধা আছে এইসব লঞ্চে।

শরিফ সিঙ্গাপুরির যেন আর তর সইছে না। তিনি বললেন, অর্শাকে নির্দেশ দিন ছোটকাকু। আজই যেন কেবিন বুক করে রাখে।

ছোটকাকু বললেন হা হা তাই হবে, তাই হবে।

অর্শা হাত ধুয়ে টেবিলে ছোটকাকুর পাশে এসে বসলো। অর্শার বান্ধবী আদিবা। আদিবার বাবার লঞ্চের ব্যবসা। মনামী নামে তাদের বড় বড় লঞ্চ আছে। এগুলো ঢাকা বরিশাল রুটে চলে। এই লঞ্চগুলো যখন সাগরের উপর দিয়ে চলে তখন ঢেউয়ের তালে তালে ছন্দ খেলে যায়। ছোটকাকু অর্শাকে বললেন, তোমার বান্ধবী আদিবাকে কল দাও। সে যেন আমাদের জন্য তিনটি কেবিনের ব্যবস্থা করে রাখে। আমরা আগামীকালই বরিশাল যেতে চাই।

অর্শাও নেচে উঠলো আনন্দে...। আহ! ছোটকাকু আমার মনের কথা বলেছেন। গতকালই আমার পরীক্ষা শেষ হয়েছে। আমরা বাংলার ভেনিসে যাচ্ছি তাহলে।

অবশ্যইÑবললেন ছোটকাকু।

বিকেলের আলো নুয়ে পড়েছে। বুড়িগঙ্গায় সূর্যের আলো ঢেউ খেলে যাচ্ছে। চিকচিক করছে সোনালি রোদ। সূর্য ডোবে ডোবে অবস্থা। এমন সময় অনিন্দ্য সুন্দর লাগে পরিবেশ। শরতের শুভ্র মেঘ উড়ে যাচ্ছে আকাশে। তার ছায়া পড়েছে বুড়িগঙ্গার বুকে। একটু পরই প্রাকৃতিক আলো নিভে যাবে। কৃত্রিম আলো জ্বলে উঠবে। সদরঘাটে সারি সারি লঞ্চ বাঁধা রয়েছে। এই লঞ্চগুলো দেশের দক্ষিণাঞ্চলে যাতায়াত করে। ঝালকাঠি, বরিশাল, বরগুনা, পটুয়াখালি, চাঁদপুর সহ কয়েকটি জেলায় অনেক বড় লঞ্চ চলাচল করে। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে এই লঞ্চগুলোকে আধুনিক করা হয়েছে। কিন্তু এখন লঞ্চের ওপর একটু চাপ কম। বিশেষ করে পদ্মাসেতু নির্মিত হবার পর থেকে লঞ্চের উপর চাপ কমে গেছে। ঈদ বা বিভিন্ন উৎসবে যখন অফিস আদালত বেশি দিনের জন্য ছুটি বেশি হয় তখন লঞ্চের উপরও চাপ পড়ে। এমনিতে আগের মতো তেমন ভিড় হয় না।

সবাই সুবিশাল কেবিনে ঢুকে তো অবাক। যেন আধুনিক ফ্ল্যাটের কোনো কক্ষ। শরিফ সিঙ্গাপুরির জন্য আলাদা সিঙ্গেল রুম দেয়া হলো। অর্শা আর সীমান্ত একটি রুমে আর ছোটকাকু আরেক রুমে। সবার পাশাপাশি রুম। কেবিনের বাইরে বেলকুনি। বিশাল বারান্দা। ছোটকাকু কেবিনে তার কাঁধের ব্যাগটি রেখেই বাইরে এসে দাঁড়ালেন। লঞ্চ ছুটে চলেছে দুরন্ত গতিতে। অর্শাও এসে ছোটকাকুর পাশে দাঁড়ালো। চমৎকার দৃশ্য। শহরের আলো ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে। লঞ্চের হেডলাইটের আলোয় বুড়িগঙ্গার পানি চিকচিক করছে। লঞ্চ চলে যাবে পদ্মা-মেঘনা আর যমুনা নদীর ত্রিমোহনায়। ছোটকাকু শুনেছেন এই ত্রিমোহনায় অনেক সময় বিপদ ঘটে। বিশেষ করে বর্ষাকালে অনেক ছোট ছোট লঞ্চ হারিয়ে যায়ে। বিশাল এলাকা নিয়ে একটা ঘূর্ণিপাক আছে। এই পাকে যদি কোনো ছোট নৌকা বা লঞ্চ প্রবেশ করে তাহলে আর বের হতে পারে না, তলিয়ে যায়। দক্ষ মাঝি হলে তারা কৌশলে এই গভীর এলাকা এড়িয়ে যায়। ছোটকাকু অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন নদীর দিকে। তিনি ভাবছেন এই নদীতে কত মানুষ লাশ হয়ে যায়। কত লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটে।

অর্শা বলল, ছোটকাকু ঘুমাবেন না?

আরে না। আমি তো আনন্দ উপভোগ করবো। দেখি নতুন কোনো প্লট পাওয়া যায় কিনা। ভাবছি একটা উপন্যাস লিখবো।

তাই নাকি? অর্শা বলল।

হাঁ ঠিক তাই।

বাহ বেশ ভালো হবে তাহলে। তবে আমার মনে হয় গোয়েন্দা সিরিজ লিখলেই ভালো হবে।

হতেও পারে। দেখি আগে প্লট খুঁজে বের করি।

শরিফ সিঙ্গাপুরি তার রুমে গা এলিয়ে দিয়েছেন। এত সুন্দর রুম আমি জীবনেও দেখিনি। লঞ্চে এত সুন্দর রুম থাকতে পারে আমার ধারণা ছিল না। আমি মনে করেছিলাম লঞ্চ মানেই শুধু সিটে বসে যাওয়া। ডেক ছাড়াও এত সুন্দর রুম আছেÑআমার জীবনের সেরা ভ্রমণ হবে এটি বললেন, শরিফ সিঙ্গাপুরি।

সীমান্ত তাকে ডেকে তুলল। উঠুন সিঙ্গাপুরি সাহেব। ছোটকাকু আপনাকে সালাম দিয়েছেন।

আহা কী আরামের বিছানা। এটা ছেড়ে তো আমার উঠতেই মন চাইছে না। কি আর করা ছোটকাকু ডেকেছেন যেতেই হবে। শরিফ সিঙ্গাপুরি আড়মোড়া দিয়ে উঠে ছোটকাকুর পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। চমৎকার আবহাওয়া। হালকা ঠান্ডা বাতাস বইছে আর নদীর পানির ঢেউয়ের শব্দ কানে আসছে।

ছোটকাকু বললেন, কী হে সিঙ্গাপুরি সাহেব কেমন লাগছে এই লঞ্চ ভ্রমণ?

অসম্ভব সুন্দর ছোটকাকু। আপনাকে ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করবো না। এমন একটি ভ্রমণ উপহার দেয়ার জন্য আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা।

চলুন আমরা লঞ্চের ক্যাফেটেরিয়ায় যাই। কি কি মেন্যু আছে দেখি।

বাহ বাহ চলুন চলুন ছোটকাকুÑঅতি উৎসাহে বললেন শরিফ সিঙ্গাপুরি।

সকলে মিলে লঞ্চের ক্যাফেটেরিয়ায় গেলেন। একটি গোল টেবিলে বসলেন তারা।

ক্যাফেটেরিয়ার শেফ ছোটকাকুকে স্বাগত জানালেন। আপনাকে স্বাগত ছোটকাকু। আপনি আমাদের এই লঞ্চে এসেছেন জেনে আমরা অত্যন্ত খুশি হয়েছি।

আপনি আমাকে চেনেন? বললেন ছোটকাকু।

অবশ্যই চিনি। আপনাকে টেলিভিশনে অনেক দেখেছি। আপনি তো দেশের সেরা গোয়েন্দা।

টেবিলে বসতেই সামনে এসে হাজির হলো কয়েকটি ডিশ। ইলিশ মাছ ভাজা। ইলিশ ভুনা। নদীর বড় চিংড়ি ভুনা। নদীর পার্শে মাছ টমেটো দিয়ে রান্না।

ছোটকাকু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন এত খাবার কিভাবে? আপনাদের রেগুলার মেন্যু কি এগুলো?

না না ছোটকাকু। আজকের মেন্যুগুলো আপনার জন্য স্পেশাল রান্না হয়েছে। আমাদের মালিকের মেয়ে আদিবা আপনার কথা আগেই জানিয়েছে।

তাই বলে এত খাবার? অনেক বড় ইলিশ মাছ তো মনে হচ্ছে।

জ্বি ছোটকাকু। এগুলো আমাদের বরিশালের মাছ। অনেক সুস্বাদু।

শরিফ সিঙ্গাপুরি বললেন, আহ কি সুঘ্রাণ! ভাজা ইলিশ মাছের গন্ধেই মন ভরে যাচ্ছে। তেলের সাথে ঘিও দেয়া হয়েছে। অনেক বিল আসবে তো....

লঞ্চের শেফ মানিক মিয়া বললেন, না না এগুলোর কোনো বিল হবে না। আপনারা এসেছেন আমাদের লঞ্চে ভ্রমণ করছেন এতেই আমরা ধন্য। তাছাড়া অর্শা আপু আমাদের ম্যাডামের বন্ধু বলে কথা। তিনি আমাদেরকে বলেছেন কোনো বিল যেন না রাখা হয়। এটা আমাদের মালিকও জানেন।

বাহ বেশ ভালো, বেশ ভালো। আনন্দিত হলাম।

একটা চিংড়ি মুখে দিয়েই শরিফ সিঙ্গাপুরি আহ কি স্বাদ বলেই উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেন।

অর্শার প্রিয় চিংড়ি আর ইলিশ মাছ পেয়ে যার পর নাই খুশি হলো।

সীমান্ত তো খুশিতে লাফিয়ে চেয়ারে পা তুলে বসে পড়লো।

রাত তখন ভোর হতে চলেছে। সবাই যার যার রুমে গিয়ে একটু শরীর এলিয়ে দিলো। শুধু ছোটকাকু বাইরে প্রকৃতির দৃশ্য দেখছেন।

দুই

চমৎকার এক সকাল। গাছে গাছে পাখি ডাকছে। দূরে মেঘনা নদী বয়ে যাচ্ছে। তার ঢেউ আছড়ে পড়ছে কূলে শো শো শব্দে। মনোরম দৃশ্য। ছোটকাকু খিড়কির দুয়ার খুলে বাইরে তাকিয়ে অদ্ভুত এক দৃশ্য দেখে আচ্ছন্ন হয়ে গেলেন। প্রাকৃতিক পরিবেশ ছোটকাকুকে খুব টানে। প্রকৃতিই যদি সুন্দর না থাকে তাহলে দেশ কিভাবে সুন্দর থাকবে। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দৃশ্য অপরূপ। ছোটকাকু দেশের বিভিন্ন জেলায় ঘুরে বেড়ান উপভোগ করেন বাংলার এই প্রাকৃতিক দৃশ্য। উপলব্ধি করেন এই দেশের প্রাকৃতিক দৃশ্য একটু অন্যরকম। প্রকৃতির এই দৃশ্যগুলো তিনি তার সবুজ খাতায় লিখে রাখেন। বাইরের আলো হাওয়া দেখতে দেখতে ছোটকাকু কেয়ারটেকার ফিরোজ মিয়ার খবর নিলেন। ফিরোজ মিয়া এলেন। বললেন, স্যার বলুন কি করতে পারি? ব্রেকফাস্ট রেডি।

আচ্ছা আমরা আসছি অন্য কাজে। ব্রেকফাস্ট এত গুরুত্বপূর্ণ নয়। জমিদার মোহন চৌধুরী এখানে কোন ডাক্তারকে দেখাতেন?

ও আচ্ছা আমি যতদূর জানি জমিদার বাবু তো জগদীশ বসাককে দেখাতেন। ডাক্তার জগদীশ বসাক সপ্তাহে দুদিন এসে জমিদার মোহন চৌধুরীকে দেখে যেতেন।

উনার চেম্বার কোথায়?

এই তো কাছেই। বেশি দূরে নয়। ছোটকাকু জেনে নিলেন জগদীশ বসাকের চেম্বার কোথায়।

সবাই মিলে হইচই করে ব্রেকফাস্ট করলেন। দেশী মুরগী আলু দিয়ে ঝোল করা। সাথে দেশীয় আটার রুটি, চিতই পিঠে। ঘিয়ে ভাজা হালুয়া আর পরোটা। জেলা শহরে এলে এসব খাবার পাওয়া যায়। বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলে পিঠাপুলির প্রচলন খুব বেশি। সবাই তৃপ্তি সহকারে খেলেন। ধন্যবাদ মোহন চৌধুরী। আপনার সঙ্গে দেখা হয়নি তাতে কি আসে যায়। কিন্তু আপনার কেয়ারটেকারের আপ্যায়নে আমরা মুগ্ধÑবললেন ছোটকাকু। ছোটকাকু কেয়ারটেকারকে বললেন, মোহন চৌধুরী না আসা পর্যন্ত আমরা দু তিনদিন থাকবো কোনো সমস্যা আছে?

কেয়ারটেকার বললেন, না না কোনো অসুবিধা নেই।

আপনি দুপুরের খাবার রেডি করুন আমরা একটু ডাক্তারের কাছ থেকে আসছি।

কি খাবেন ছোটকাকু?

স্পেশাল কোনো আইটেম নেই তবে এখানকার রাজহাঁসের মাংস হলে মন্দ হয় না। কিন্তু খাবারের চেয়ে আমার প্রয়োজন মোহন চৌধুরীকে। তিনি কোথায় হারিয়ে গেলেন তাকে তো খুঁজে বের করতে হবে।

নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ইÑবললেন কেয়ারটেকার।

তাকে পেলে তো ধরে বেঁধে নিয়ে আসা যেতো। আমরা একটু চেষ্টা করে দেখি।

করুন করুন চেষ্টা করে দেখুন জমিদার সাহেব কোথায় গেলেন।

ডাক্তার জগদীশ বসাক তখনো চেম্বারে আসেননি। ছোটকাকু অপেক্ষা করতে থাকলেন। কিছুক্ষণ পর একজন ভুড়িওয়ালা লোক প্রবেশ করলেন। হাতে একটি ডাক্তারি ব্যাগ। হন্তদন্ত হয়ে ঢুকলেন চেম্বারে। ছোটকাকু বললেন, আপনার সঙ্গে একটু কথা আছে।

তিনি বললেন, হা বলুন। মোহন চৌধুরীর ডিমেনশিয়া রোগটি কতদিনের?

এই তো হবে পাঁচ ছয় বছর।

এখন কন্ডিশন কেমন?

অনেক দিনই তো আসলে খবর জানি না। মোহন চৌধুরী ঢাকায় যেতেন সেখানে কোনো ডাক্তারের কাছে তিনি চিকিৎসা নিতেন।

আপনি এটা কি করে টের পেলেন যে মোহন চৌধুরীর ডিমেনশিয়া।

তিনি অনেক কিছুই ভুলে যাচ্ছিলেন। মাঝে মাঝে অসংলগ্ন কথা বলতেন। তখনই বুঝতে পারলাম তার এই রোগের কথা। তিনি ঢাকাতেই চিকিৎসা নিতেন। আমি মাঝে মধ্যে তার বাড়িতে গিয়ে দেখে আসতাম। ডিমেনশিয়া ছাড়াও অন্যকোনো অসুখ আছে কিনা ইত্যাদি।

Image

রিয়ে যাবেন এতটাই সমস্যা ছিল?

সত্যি বলতে কি এটা আমিও টের পাইনি। বুঝতে পারিনি যে এতটা খারাপ হবে। হঠাৎ করে কোথায় হারিয়ে গেলেন এটাই ভাবছি। ঘরবাড়ি সহায় সম্পদ প্রতিপত্তি সব ভুলে কোথায় যে গেলেন। এজন্য ডিমেনশিয়া রোগীদের খুব সাবধানে থাকতে হয়। এদের সঙ্গে লোকজন রাখতে হয়। সেসবে কোনো ঘাটতি ছিল কিনা আমি জানি না।

আপনি কোনো ক্লু দিতে পারলেন না?

কি করে বলি বলুন। আমি তো আমার পেশাগত দায়িত্ব নিয়ে ব্যস্ত থাকি।

ঢাকার ডাক্তারের কোনো ঠিকানা আছে কি?

হা যতদূর জানি তিনি বনানীতে বসেন। ডাক্তারের নাম বরেন সাহা।

ডাক্তারের কোনো ফোন নাম্বার আছে? থাকলে দিন।

ডাক্তারের ফোন নম্বর নিয়ে ছোটকাকু ধন্যবাদ দিয়ে বেরিয়ে গেলেন।

ছোটকাকু বললেন, ভুলতে ভুলতে যখন ভোলাতে এসে পড়েছি চলো খোলা দোকানে এককাপ চা খাই। চা খেতে খেতে চায়ের দোকানদারকে ছোটকাকু জিজ্ঞেস করলেন, এই যে জমিদার মোহন চৌধুরী তাকে কি চিনতেন?

খুব ভালো চিনতাম।

কিভাবে চিনতেন?

তিনি দুদিন আগেও আমার দোকানে এসে বসলেন আর বললেন তার পূর্ব পুরুষদের কথা। কে কেমন ছিলেন।

কি করলেন তিনি এখানে বসে বসে?

এখানে বসে চা খেলেন তারপর চলে গেলেন।

আর কি গল্প করলেন?

এমন গল্প করলেন যে গল্প তার করার কথা না। সেই পুরনো দিনের কথা।

তারপর কোথায় গেলেন?

আমি তো দেখলাম তিনি বাড়ির দিকে গেলেন।

উনাকে যে তিনদিন ধরে পাওয়া যাচ্ছে না এটা কি জানেন?

জানি।

কোথায় গেলেন তিনি বলুন তো। আপনার কোনো ধারণা ?

আমি একদম জানি না স্যার। আমি যতদূর জানি তিনি তো একা একা অনেক জায়গা চলে যেতেন। ঢাকাতেও তাকে অনেক খোঁজা হয়েছে কিন্তু পাওয়া যায়নি শুনেছি।

তাহলে কোথায় খুঁজবো তাকে?

তা তো জানি না স্যার। তবে তার এক ম্যানেজার আছে ইমরান মন্ডল তিনি হয়তো কোনো খবর জানলেও জানতে পারেন।

ম্যানেজারকে কোথায় পাবো?

তিনি তো জমিদার বাবুকে খুঁজতে বেরিয়ে গেছেন।

তিনি কোথায় খুঁজতে গেছেন জানেন কি?

চা-এর দোকান থেকে ছোটকাকু বেরিয়ে হাঁটতে লাগলেন। সবাই মিলে ভোলাদ্বিপ দেখতে বেরিয়ে পড়লেন। চেয়েছিলেন বরিশাল দেখতে কিন্তু চলে এসেছেন ভোলাতে। এখানে অনেক পুকুর। এসব পুকুরে দেশীয় মাছ চাষ হয়। হাঁটতে হাঁটতে জমিদার বাড়িতে গেলেন। ঘুরে ঘুরে দেখলেন বাড়ির চারপাশ। এই বাড়িতে অনেক দুর্লভ জিনিস রয়েছে। ভেতরের কারুকার্য দেখার মতো। মনোমুগ্ধকর পরিবেশ এখানে। বাইরেও মার্বেল পাথরের তৈরি অনেক ভাষ্কর্য দাঁড়িয়ে আছে। বাড়ির চারপাশে বাগান। নানারকম গাছপালা দিয়ে সাজানো। প্রাচীন জমিদার বাড়ি যেমনটি থাকে সেরকমই। মোহন চৌধুরীর দাদারা এগুলো নির্মাণ করেছেন। বাড়িতে রয়েছে বিশাল একটি পুকুর। শান বাঁধানো ঘাট। পুকুরের পাড়ে বসে মিষ্টি হাওয়া খেতে খেতে মন ভরে গেল ছোটকাকুর। এরমধ্যে হাসতে হাসতে কেয়ারটেকার এলেন।

স্যার এখানে বসে আছেন?

জ্বি। পুকুরের মিষ্টি হাওয়া খাচ্ছি।

বাহ বেশ ভালো বেশ ভালো। জানেন কি এই পুকুরের ভেতরে দুটো পিতলের মূর্তি আছে।

কি করে তারা?

তাদের মুখে দুটো মাছ আছে। এগুলো পুকুরে থাকলে অনেক মাছ হবে এই ধারণা অনেকের। যখন জেলেরা পুকুর সেচ দেয় তখন মূর্তি দুটো পায়। আবার সেগুলোকে পুকুরেই রেখে দেয়।

বাহ ভালো তো...

এটা গল্প ভাববেন না স্যার সত্য ঘটনা। ওরা না থাকলে আর মাছ হবে না পুকুরে।

আর কি কি ঘটনা আছে এই বাড়িতে?

অনেক কিছুই আছে। এই যে বাগানে মার্বেল পাথরের যে মূর্তি দেখলেন এগুলো যদি সরিয়ে নেয়া হয় সেদিনই প্রচ- ঝড় হয়।

তাই! এটাও তো মজার তথ্য। আর কিছু?

এই বাড়িতে একা একা ছাদে যাবেন না। ছাদে দু তিনটি ঘর আছে সেখানে কজন বয়ষ্ক মহিলা থাকেন। তাদের কোনো ছেলে সন্তান নেই। তারা খুনখুনে বুড়ি। তারা আপনাকে যেকোনো বিপদে ফেলে দিবে যদি একা যান।

এদের কোনো পরিচয়?

আসলে এরা মোহন চৌধুরীর বাবার কাছে এসেছিল সাহায্যের জন্য। তদেরকে তিনি আশ্রয় দিয়েছিলেন। মোহন চৌধুরী পরে তাদেরকে ছাদে থাকতে দেন। শোনা যায় সত্তরের গোর্কীর সময় এরা এসেছিলেন। এদের বাড়িঘর লন্ডভন্ড হয়ে যায় ঝড়ে তখন তাদেরকে জমিদাররা আশ্রয় দেন।

তাহলে তো এদের সঙ্গে একদিন দেখা করতে হয়।

নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই একদিন দেখা করবেন।

আচ্ছা মোহন চৌধুরীর ম্যানেজার কি ফিরেছেন?

না স্যার তিনি তো জমিদার বাবুকে খুঁজতে গেছেন এখনো আসেননি।

তাহলে তার ফোন নাম্বারটা থাকলে দিন।

নিশচ্য়ই স্যার।

ইমরান মন্ডলকে ফোন দিতেই তিনি সঙ্গে সঙ্গে ফোন রিসিভ করলেন।

হ্যালো। কে বলছেন বলুন।

আমি ছোটকাকু বলছি...

ছোটকাকু মানে?

মানে ছোটকাকু বলছি?

কোন ছোটকাকু?

নিজের পরিচয় কিভাবে দেই!

আচ্ছা বলুন তো আপনি কি সেই ছোটকাকু যাকে আমরা ফরিদুর রেজা সাগরের কাহিনির মধ্যে দেখি?

জ্বি আপনি ঠিক ধরেছেন। আমি সেই ছোটকাকু বলছিলাম।

ওরে বাবা। আপনার ফোন। এটা তো বিশাল সৌভাগ্যের ব্যাপার।

আপনি কোথায় আছেন?

আছি তো ভোলা দ্বিপেই। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছি।

কেন?

জমিদার মোহন চৌধুরীকে খুঁজে বেড়াচ্ছি।

কারণ?

তিনি নিখোঁজ রয়েছেন তিনদিন ধরে।

তার সন্ধান কি পাওয়া গেল?

আমি তো ভোলাদ্বিপেই এসেছি। উঠেছি মোহন চৌধুরীর বাড়িতে। উনি তো আমার বন্ধু মানুষ।

তাই নাকি! তাহলে তো আপনার সঙ্গে আমার দেখা হবে। আমি মোহন চৌধুরীকে খুঁজে তারপর আসছি। ছোটকাকু বললেন, আমি ফোন দিলে আপনি একটু রিসিভ করবেন প্লিজ।

নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই।

ইমরান মন্ডলের সঙ্গে কথা শেষ করেই ছোটকাকু পুকুরের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। আর ভাবছেন মোহন চৌধুরীকে কিভাবে পাওয়া যায় কোনো রকম কোনো ক্লু নেই। দেখলেন পুকুরের পানিতে কয়েকটি মাছ লাফ দিয়ে আবার তলিয়ে গেল। ব্যাগ থেকে সবুজ খাতাটি বের করে মোহন চৌধুরী সম্পর্কে নোট লিখতে লাগলেন ছোটকাকু।

তিন

মোহন চৌধুরী খুব সৌখিন জমিদার। বাড়িটিতে চক্কর দিলেই সেটা টের পাওয়া যায়। সকালে যখন ছোটকাকু বাগানে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন তখন খেয়াল করেছেন পুরনো দিনের ফরাসি কিংবা ব্রিটিশ ভাষ্কর্য, নারী ভাষ্কর্য ছড়ানো ছিটানো রয়েছে বাগান জুড়ে। এসব হয়তো অনেক কষ্ট করে মোহন চৌধুরী জোগাড় করেছেন। সেকালে এগুলো জোগাড় করা খুব কঠিন ছিল। মার্বেল পাথরের ভাষ্কর্য সৌখিনতার পরিচয় বহন করে। বাগানের সৌন্দর্য দেখে যখন ছোটকাকু নাস্তা খেতে গিয়েছেন তার আগে তিনি গেলেন মোহন চৌধুরীর লাইব্রেরিতে। লাইব্রেরি দেখে ছোটকাকু বিস্মিত হলেন। দুশো বছর আগে স্প্যানিস ভাষায় লেখা বইও আছে আবার রবীন্দ্রনাথের রচনাবলীর প্রথম খন্ডও আছে। লাইব্রেরি ঘুরে দেখতে দেখতে চমকে উঠলেন ছোটকাকু। দেখলেন একটি র‌্যাকে ফরিদুর রেজা সাগর-এর লেখা ছোটকাকু সিরিজগুলি সাজানো আছে। মনে মনে ছোটকাকু ভাবলেন ছোটকাকু সম্পর্কে তাহলে মোহন চৌধুরী জানেন। এটা জেনে আনন্দ পেলেন ছোটকাকু। মোহন চৌধুরীর সঙ্গে কখনো দেখা হয়নি তবে ছোটকাকু বুঝে ফেলেছেন জমিদার শিক্ষিত মানুষ। রুচিশীল মানুষও বটে। লাইব্রেরির পাশেই রয়েছে বিশাল একটি একুইরিয়াম। নানারকম মাছ সেখানে খেলা করছে। বাগানের একাংশে রয়েছে ছোট্ট একটি চিড়িয়াখানা। সেখানে খরগোশ, হরিণ, কুমির ছাড়াও রয়েছে ময়ূর সহ নানা প্রকার পাখি। কয়েকটি খাঁচায় আছে বড় অজগর সাপ। এসব দেখে ছোটকাকুর ধারণা হলো মোহন চৌধুরী কোনো সাধারণ লোক নন। তিনি একেবারেই অন্যরকম মানুষ। লাইব্রেরিতে পেলেন শেক্সপিয়ারের হ্যামলেট এর একটি পুরনো সংস্করণ। বইটি চামড়ার বাঁধাই করে খুব যতেœ রাখা হয়েছে। বুঝা গেল তিনি এন্টিকের সংগ্রাহক। পুরনো দিনের সবকিছু সংগ্রহ তার শখ। বই তারমধ্যে একটি দুর্লভ জিনিস।

অর্শা বলল, ছোটকাকু শুধু কি গবেষণা করলে চলবে আমরা তো ভোলাদ্বিপটা একটু ঘুরে আসতে পারি। ছোটকাকু বললেন তা তো অবশ্যই যায়। চলো আমরা একটু রিল্যাক্স করে আসি। কাজ তো অনেকই হলো। তাদের সঙ্গে কোনো বাহন নেই। সকলে মিলে হাঁটতে লাগলো। কিছুক্ষণ হাঁটার পর তারা রিকশা নিলেন। ছোটকাকু আর অর্শা একটি রিকশায়, সীমান্ত আর শরিফ সিঙ্গাপুরি আরেক রিকশায়। তারা হইচই করতে করতে ঘুরতে লাগলেন। ছোটকাকু একবার ভাবলেন থানায় যাবেন। তার ধারণা হয়তো ওসি সাহেব জানেন মোহন চৌধুরী কোথায় আছেন। ভোলাদ্বিপ ঘুরে সবাই ক্লান্ত। দুুপরে এলেন জমিদার বাড়িতে। সেখানে দুপুরের খাবার খাবেন। কেয়ারটেকার ফিরোজ মিয়া সবকিছু রেডি করে রেখেছেন।

জমিদারদের পুকুরে গোসলে নামলেন ছোটকাকু। অর্শা আর সীমান্ত সাঁতার কাটলো। শরিফ সিঙ্গাপুরি এক জায়গায় দাঁড়িয়ে হুঁশ হুঁশ করে ডুব দিতে লাগলেন। এর মাঝে বড় একটি মাছ এসে শরিফ সিঙ্গাপুরিকে গুঁতো দিয়ে চলে গেল। শরিফ সিঙ্গাপুরি চিৎকার দিয়ে উঠলেন। মাগো বাবাগো কুমিরে ধরছে মনে হয়। কেয়ারটেকার ফিরোজ মিয়া পাড়ে বসে হাসলেন।

চিৎকার করে বললেন ভয় পাবেন না। পুকুরে অনেক বড় বড় মাছ আছে। তারা মানুষের সাথে খেলা করে। কাছে এসে ঘা মারে। ভয়ের কিছু নেই।

ছোটকাকু বললেন, আমাকেও তো গুঁতো দিয়েছে। ভালোই লাগলো।

শরিফ সিঙ্গাপুরি কাঁদো কাঁদো স্বরে বললেন, আমি তো ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। ভাবলাম এই বুঝি আমাকে কুমিরে খেয়ে ফেলে। সবাই হো হো করে হেসে উঠলেন।

পুকুরের ঠান্ডা পানিতে গোসল করে শান্তি পেলেন ছোটকাকু। সকলে এসে ডাইনিং টেবিলে খেতে বসলেন। টেবিল জুড়ে নানারকম খাবার। দেখা গেল স্কুলড্রেস পরা দুটি বাচ্চা হইহই করে বাড়ির ভেতর ঢুকলো। ছোটকাকু জানলেন এরা হলো মোহন চৌধুরীর ভাইয়ের ছেলেমেয়ে। এরা এখানেই থাকে। লেখাপড়া করে একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে। কারো সঙ্গে তারা কথা বলল না, চলে গেল বাড়ির ভেতরে। খাবার টেবিলে বড় ইলিশ মাছ কাঁটা ছাড়া রান্না। রুই মাছ ভাজা। আলু দিয়ে কাচকি মাছের চচ্চড়ি। রুপোলি রঙের টাটকিনি মাছ। দেশি কই মাছ ভুনা। ছোটকাকুর মনে পড়লো এটি একটি নদী বিধৌত এলাকা তাই এখানে মাংসের চেয়ে মাছের কদর বেশি। হঠাৎ ছোটকাকুর চোখে পড়লো টেবিলের কোণায় ছোট্ট একটি কাগজ। কাগজটি খুলে পড়তে লাগলেন তিনি।

কাগজটিতে লেখাÑআমরা জমিদার মোহন চৌধুরী সম্পর্কে একটি গুজব রটিয়ে দিয়েছি। আমাদের টার্গেট জমিদার বাড়ির সব এন্টিক জিনিস আর মার্বেল পাথরের মূর্তিগুলো। এগুলো বিক্রি করতে পারলে অনেক অর্থ পাওয়া যাবে। কিন্তু মোহন চৌধুরীর বাড়ির লোকেরা খুব সচেতন তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে কোনোকিছু করা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। তবুও আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি সফল হবো আশা করছিÑকোনো নাম ধাম নেই। চিঠি শেষ করে দিয়েছে। ছোটকাকু মুচকি হেসে চিঠিটি ভাজ করে পকেটে রেখে দিলেন। তাকেও বিভ্রান্ত করা হচ্ছে কি না সেটাও দেখার ব্যাপার। তিনি আর কোনো মাথা না ঘামিয়ে খেতে লাগলেন। শরিফ সিঙ্গাপুরির মাছ ভালো লাগে না। কাঁটা তিনি বাছতে পারেন না। কিন্তু কাঁটা ছাড়া ইলিশ মাছ দেখে তিনি মজা করে খেলেন।

বললেন, দারুণ দারুণ! এমন মাছ আমি জীবনেও খাইনি।

ছোটকাকুর ভাবনায় শুধু মোহন চৌধুরী। তিনি ভাবছেন একজন সুস্থ মানুষকে কিভাবে অসুস্থ আখ্যা দিয়ে দূরে রাখা যায়। কত রকম দুষ্টু বুদ্ধি নিয়েই না মানুষ কাজ করে। মানুষ ক্ষুদ্র স্বার্থের জন্য মানুষ কতকিছুই না করে। ভাবতে ভাবতে খাবার শেষ করলেন ছোটকাকু।

চার

ছোটকাকু খাওয়া শেষ করে বিছানায় একটু শরীর এলিয়ে দিলেন। একটু ঝিমুনি এসেছে মাত্র। চোখ বুজে আছেন এমন সময় একটি ফোন এলো। ফোনটা রেখেই তিনি শরিফ সিঙ্গাপুরিকে সাথে নিয়ে চলে গেলেন থানায়। সেখানে গিয়ে মোহন চৌধুরীর সঙ্গে দেখা হলো ছোটকাকুর।

ছোটকাকুকে দেখে মোহন চৌধুরী বললেন, আপনার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে কিনা জানি না তবে ফরিদুর রেজা সাগর আপনাকে নিয়ে চল্লিশটি ছোটকাকু লিখেছেন। সবগুলি বই আমি পড়েছি। অধিকাংশ চরিত্র আমার মুখস্ত। আপনি বিভিন্ন জেলায় গিয়ে নানা ধরনের সমস্যা সমাধান করেন। আপনার কষ্ট হচ্ছে কিনা বাসায় আমিও নেই। কয়েকজন পুলিশ সদস্যসহ মোহন চৌধুরী আর ছোটকাকুকে পৌঁছে দিলেন জমিদার বাড়িতে। মোহন চৌধুরী বাড়িতে এসে অনেক খুশি। সন্ধ্যেবেলা ছোটকাকুকে নিয়ে লাইব্রেরিতে প্রবেশ করলেন।

মোহন চৌধুরী বললেন, ভাইরে জমিদারি অনেক কঠিন। সেটা বুঝা যায় না জমিদার নাহলে। এই যে আমাকে নানাভাবে বিভিন্ন রোগের অজুহাতে হাওয়া করে দেয়ার চেষ্টা চলছে।

ছোটকাকু বললেন, আমি থাকতে দেখি আপনাকে কে বা কারা হাওয়া করে সেটা দেখবো।

জমিদার তখন ছোটকাকুর বইগুলো দেখিয়ে বললেন, দেখেছেন তো এই র‌্যাকে সবই ছোটকাকুর বই। এই র‌্যাকে রেয়ার বই আছে। টমসয়ারের ১৯০৪ সালের বই আছে। এলিস এন অন্ডারল্যান্ডের ১৮৪১ সালের এডিশন আছে। রবীন্দ্রনাথের বলাকা কাব্যগ্রন্থের ১ম এডিশন এখানে আছে। মোহন চৌধুরী যখন কথা বলছিলেন তখন তার চোখে মুখে উচ্ছ্বাস প্রকাশ পাচ্ছে। বিভিন্ন দেশ থেকে অর্ডার দিয়ে এগুলো আমি সংগ্রহ করেছি। এগুলো আমার স্বপ্নের মতো। এগুলো আমি কাউকে দিতে পারব না।

নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই কেন দিবেন, কিন্তু এইসব রেয়ার জিনিসগুলো নেয়ার জন্যই আপনাকে অসুস্থ বানাতে চাইছে কেউ কেউ বললেন ছোটকাকু। আপনাকে ভুলে যাওয়া রোগে ফেলে দেয়া হচ্ছে। যেন আপনি সবকিছু ভুলে যান। এজন্যই তারা বলেছে আপনার ডিমেনশিয়া হয়েছে। আপনি এতক্ষণ লাইব্রেরিতে বসে যে বর্ণনা দিচ্ছেন তাতে মনে হয় আপনি সুস্থ আছেন।

জমিদার বাবু তখন হাততালি দিলেন ঠিক বলেছেন, ঠিক বলেছেন। ধন্যবাদ আপনাকে। আপনি যে বিশ্বাস করেননি আমার ডিমেনশিয়া হয়নি এজন্য আপনাকে আবারও ধন্যবাদ।

এরমধ্যে লাইব্রেরিতে কেয়ারটেকার ফিরোজ মিয়াা এলেন। তিনি বললেন, কয়েকজন লোক এসেছিল তারা বলল আইনের লোক।

কি বললেন তারা?

তারা বললেন, জমিদার ডিমেনশিয়ার রোগী হঠাৎ করে তিনি হারিয়ে যাবেন। মাঝে মাঝে উল্টাপাল্টা কথা বলবেন। তাকে একটু ঠিকমতো পাহারা দিয়ে রাখতে হবে। আমরা তার তদারকির জন্য এসেছি। আইনের লোকেরা বললেন আমরা মাঝেমধ্যে আসবো আপনাদের সহযোগিতা চাই।

সব শুনে জমিদার মোহন চৌধুরী হাসতে লাগলেন।

ছোটকাকু বললেন, ডোন্টঅরি আইনের লোক আমরাও। সবাই মিলে সহযোগিতা করবো যেন জমিদার মোহন চৌধুরী সুস্থ থাকেন। আপনি সুস্থ না থাকলে সব অর্থহীন হবে। মানুষের কাছে জমিদার সম্পর্কে কে বা কারা বিভ্রান্তিমুলক কথা ছড়াচ্ছে। অনেকেই বলছে মোহন চৌধুরী ভুলতে ভুলতে ভোলাতে চলে এসেছেন। এটা কি সত্য?

আপনার কি তাই মনে হয়? আমি বর্ষাকালটা একটু বরিশালে কাটাই। আমার ভালো লাগে। আর এটা তো আমার পূর্বপুরুষের বাড়ি। ব্রিটিশ আমলে তৈরি। কোথায় যাবো এই বাড়ি ছেড়ে? আর আমার এই লাইব্রেরি ছেড়ে কোথাও যাবার প্রশ্নই ওঠে না। মানুষের যন্ত্রণায় আমি মনে হয় অসুস্থ হয়ে পড়ছি। বাদ দেন এসব এখন। চলুন সন্ধ্যায় অন্যরকম চা খাওয়াই আপনাকে।

কি রকম চা?

এটা ১১ রকম চা পাতার মিশ্রণে একটি চা। ভিন্নরকম স্বাদ এর। ইংল্যান্ডে এই চা-এর খুব খ্যাতি আছে। ব্রিটিশরা যখন এই ভারতবর্ষ শাসন করে তখন তারা এই চা খুব পান করতো। এই চা খেলে আপনার ভালো লাগবে। এটা শুধু সন্ধ্যাবেলা খাওয়া হয়। আসলেই ছোটকাকু বিমোহিত হলেন এই চা-এ চুমুক দিয়ে।

এই চা জোগাড় করেন কিভাবে?

চীন থেকে।

চীন থেকে? অবাক হলেন ছোটকাকু।

হা। চীন থেকে জাহাজে করে আসে এই চা। আমি এখান থেকে কিছুটা কিনে রাখি। সন্ধ্যেবেলা সারাবছরই খাই।

আর যখন অসুস্থ হয়ে পড়েন?

জমিদার বাবু একটু হাসলেন। আরে আমি কি অসুস্থ হয়ে পড়ি আমাকে অসুস্থ বানানো হয়। তারপর দুজনই হাসতে লাগলেন হাহাহাহা...

পাঁচ

পরদিন জমিদার মোহন চৌধুরী আবার নিখোঁজ। সকালে একদল লোক এসেছিল তারা ১৯৪১ সালের আনন্দ বাজার পত্রিকা এনেছিল। এই পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় রবীন্দ্রনাথের বড় একটি ছবি ছাপিয়ে মৃত্যুদিনের খবর ছাপা হয়েছিল। এসব পত্রিকা খুবই দুর্লভ। তারা মোহন চৌধুরীকে বলল, এরকম আরও অনেক পত্রিকা তাদের কাছে আছে। তারা জানে এইসব ব্যাপারে মোহন চৌধুরীর অনেক আগ্রহ। লোকগুলো আরও জানালো তাদের কাছে অনেক রেয়ার জিনিস আছে। অনেক লোভ দেখিয়ে তারা মোহন চৌধুরীকে তাদের সাথে নিয়ে গেল।

তিনি বললেন, এখনই যাবো চলুন।

তিনজন লোক জমিদার মোহন চৌধুরীকে তাদের সঙ্গে রিকশায় নিয়ে যেতে লাগলো। যাবার সময় রটিয়ে গেল ডিমেনশিয়ার রোগী ভোরবেলা কোথায় যেন চলে গেছেন। তিনি লোকদের সাথে গিয়ে দেখলেন বেশি পত্রিকা নেই। অল্পকিছু পত্রিকা আছে। ইত্তেফাক, যুগান্তর আর কিছু আনন্দ বাজার পত্রিকা। অবশ্য পত্রিকাগুলো বিশেষ দিনে প্রকাশিত সংখ্যাগুলো।

জমিদার বললেন কত টাকা লাগবে?

লোকগুলো বললেন, এটা কোনো ব্যাপার না। আপনার সাথে তো টাকার সম্পর্ক নয়। আপনি একজন বিজ্ঞ সংগ্রাহক আমরা আপনাকে সম্মান করি।

জমিদার বললেন, বাহ দারুণ বাহ দারুণ। এগুলো তো আসলে অমূল্য।

এগুলো আমাদের কাছে রেখে কোনো লাভ নেই। আপনাকে এগুলো দিতে চাই। আপনার লাইব্রেরিতে এগুলো যতেœ থাকবে। অনেকেই এটার সাক্ষী হিসেবে থাকবেন।

খুব ভালো, খুব ভালো। আমি অনেক কৃতজ্ঞ আপনাদের কাছে।

তারা তিনজনও খুশি হলেন কিন্তু তাদের নাম বললেন না। তারা শুধু সিম্বলিক নাম বললেন, এ, বি,সি। জমিদার পত্রিকাগুলো নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ভোলা দ্বিপের লাইব্রেরিতে গেলেন। যেকোনো লাইব্রেরিতে গেলে মোহন চৌধুরীর আর খবর থাকে না। তিনি গভীর মনোযোগ দিয়ে লাইব্রেরিতে অধ্যয়ন করেন। এখানে তিনি পঞ্চাশ দশকের দেশ পত্রিকা, আনন্দ বাজার পত্রিকা, চল্লিশ দশকের কল্লোল পত্রিকা, ত্রিশ দশকের কবি ও কবিতা। এসব পত্রিকার ফাইল উল্টাতে লাগলেন গভীর মনোযোগ দিয়ে আর বিস্মিত হতে লাগলেন। বাংলা সাহিত্য কতই না সমৃদ্ধ। কত গুরুত্বপূর্ণ ছিল তাদের লেখা। অনেক লেখকের কাছ থেকে সম্পাদক লেখা চেয়ে ছেপেছেন বা লিখিয়েছেন। অনেক লেখকের আবির্ভাব ঘটেছে এসব নিয়ে গবেষণা হওয়া উচিৎ।

সন্ধ্যেবেলা লাইব্রেরিয়ান এসে বললেন, স্যার লাইব্ররির সময় তো শেষ কাল আবার আসবেন।

এই কি বলো! আমি দেশ পত্রিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা পড়ছি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় প্রকাশিত দেশ। এটা না পড়ে তো আমি যাবোই না। তুমি থাকো তোমাকে কিছু টাকা দেব আমি। লাইব্ররিয়ান খুশি হয়ে তাকে সময় দিলেন। জমিদার রাতদিন সেখানেই পত্রিকা পড়ে সময় কাটালেন। আর এদিকে রটে গেল যে জমিদার নিখোঁজ হয়েছেন। পরদিন জমিদার ফিরে এসেছেন। প্রচ- খিদে তার। ঘরে ঢুকেই বললেন, কিছু খেতে দাও তাড়াতাড়ি। কোথায় ছিলেন, কি করছিলেন কিছুই তিনি বললেন না। ভাত ডাল মাছ মাংস দেয়া হলো জমিদার বাবু খুব তৃপ্তি সহকারে খেলেন।

ছোটকাকু বললেন, তার টেনশনে তিনিও খাননি।

মোহন চৌধুরী হেসে বললেন, আরে আমার জন্য টেনশন করবেন না। আমি এক পাগল লোক বুঝলেন। পাগলদেরই হয়তো ডিমেনশিয়া হয়। তাই ওরা সহজেই রটিয়ে দিয়েছে যে আমার ডিমেনশিয়া। চা খাবেন নাকি? চলুন তাহলে লাইব্রেরিতে গিয়ে চা খাই।

দুজন গিয়ে লাইব্রেরিতে বসলেন। পল্লী বিদ্যুতের মৃদু আলো মোমের আলোর মতো চিকচিক করছে। এই মধ্যরাতে আপনাকে একটা কবিতা শোনাইÑবলেই বিহারী লাল চক্রবর্তীর একটি কবিতার বই বের করলেন জমিদার বাবু। তিনি কবিতা পড়ছেন। ছোটকাকু কবিতা শুনছেন আর তার চোখ খুঁজে বেড়াচ্ছে লাইব্রেরির র‌্যাক। তিনি ইংরেজি বইয়ের র‌্যাকের দিকে তাকালেন। র‌্যাকের কয়েকটি জায়গা খালি হয়ে গেছে। বইগুলো নেই। প্রায় আর্তনাদ করে উঠলেন মোহন চৌধুরীÑআমার শেক্সপিয়ার, আমার শেক্সপিয়ার বলে। আমার ওয়ার্ডসওয়ার্থ কোথায় গেল, কোথায় গেল...আমার হুইটম্যান কই..ইত্যাদি বলে তিনি প্রলাপ বকতে লাগলেন। তখনই তার মনে পড়লো সকালে যারা এসেছিল তারা তো লাইব্রেরিতে বসছিল। হয়তো পত্রিকা দেখানোর ছলনায় বইগুলো লোপাট করে দিয়েছে। তাদেরকে এখন কোথায় পাওয়া যায় নামও তো নেই। এরা এ, বি, সি নামে পরিচয় দেয়।

পুরো গল্পটা শুনে ছোটকাকু বললেন, এভাবেই জমিদার বাড়িতে সবাই সবকিছু ভুলে যাচ্ছে। একেরপর এক লোপাট হয়ে যাচ্ছে বাড়ির মূল্যবান সম্পদ। ছোটকাকুর মুখে আর ভাষা নেই। এগুলো উদ্ধার করাই এখন একমাত্র কাজ হবে। এগুলো ভাবতে ভাবতেই ছোটকাকুর রাগ হয়ে গেল। আপনি এগুলো তদারকি করেন না বলেই এখন এই অবস্থা। কোনো লোক রাখেননি এসব পাহারা দেয়ার জন্য।

ঠিক আছে এগুলো দেখভালের জন্য লোক রাখা প্রয়োজন ছিল।

এই জমিদার বাড়ি তো একটু নিরিবিলি। তেমন কোনো লোকজন নেই। যার কারণে অপরাধীরা সুযোগ পেয়ে এখান থেকে বিভিন্ন দামি আসবাব, মূর্তি আর পুরনো বই চুরি হচ্ছে।

হঠাৎ মোহন চৌধুরীর নজর গেল বইয়ের ফাঁকে কামিনি রায়ের একটি স্কেচ ছিল সেটাও নেই। এটা তাদের পারিবারিক সংগ্রহ ছিল। মোহন চৌধুরীর দাদা এটা কলকাতা থেকে মাত্র দেড় টাকা দিয়ে কিনেছিলেন। ধপাস করে পড়ে গেলেন মোহন চৌধুরী। এত শখের একটা জিনিস হারিয়ে যাবে! তিনি ভাবতেও পারেননি। এই ছবিটা কত কষ্টে ধরে রেখেছি সেটা বলে বুঝানো যাবে না। রং যেন চটে না যায় সেই চেষ্টাই করেছি।

ঘাবড়াবেন না সব ছবিই উদ্ধার করবো। তবে একটি বড় সিন্ডিকেট আপনার বিপরীতে কাজ করছে। তারা চাচ্ছে আপনার এখানকার এন্টিক জিনিসগুলোকে সরিয়ে ফেলতে। এখন থেকে আপনাকে আরও সাবধান থাকতে হবে। পাহারাদার বসাতে হবে। তাহলে যদি বাকি জিনিসগুলো রক্ষা করা যায়।

অবশ্যই, অবশ্যই বলেই মোহন চৌধুরী হাহাকার করে উঠলেন। কামিনি রায়ের ছবিটির কথা তার খুব মনে পড়তে লাগলো। অসাধারণ একটি ড্রয়িং। একজন নারীর কাঁখে একটি কলসি। বাংলার চিরায়ত নারী। হায় রে আর ছবিটা বুঝি দেখা হবে না। চায়ের কাপে চুমুক দিলেন মোহন চৌধুরী। ছোটকাকুও চায়ে চুমুক দিয়ে গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে গেলেন এই মধ্যরাতে। জমিদাররা হয়তো ভেবেছিলেন এই ভোলাদ্বিপে এমন একটি সংগ্রহশালা গড়ে তুললে কেউ এই এন্টিক জিনিসের মূল্য বুঝবে না। চুরিও হবে না। কিন্তু ঘটনা ঘটলো বিপরীত। এগুলোকে রক্ষা করতেই হবে।

ছোটকাকু বললেন, সকালবেলাই থানায় জিডি করতে হবে। রাজি হলেন মোহন চৌধুরী। রাত জেগে তারা সবকিছুর একটা তালিকা তৈরি করলেন। বাংলা বই, ইংরেজি বই কিছু পেইন্টিং। কিছু এন্টিক যেমন কাজলদানি, সুরমাদানি, মোমবাতি রাখার পাত্র। কাসার প্রাচীন বাটি। কাসার বড় বড় থালা। সাদা পাথরের মূর্তি সহ বাড়িতে থাকা পাথরের তৈরি নানান রকম জিনিসের। এসবের তালিকা করতে করতে ভোরের আলো ফুটে উঠলো। ভোরবেলা ছোটকাকু আর মোহন চৌধুরী হাঁটতে বের হলেন। অমনি দেখলেন তিনজন লোক দৌড়ে ছুটে চলেছে। ছোটকাকু তাদেরকে ধাওয়া করলেন কিছুক্ষণ। কিন্তু ধরতে পারলেন না। তারা ডানদিকের একটি গলি দিয়ে দ্রুত পালিয়ে গেল।

জমিদার মোহন চৌধুরী বললেন, এই সেই তিন পালোয়ান এ, বি, সি। যারা কালকে হয়তো আমার বই কিংবা কামিনি রায়ের ছবি চুরি করেছে।

এরা তো এই ভোলা দ্বিপেরই লোক মনে হয়Ñ ছোটকাকু বললেন।

তাই-ই হবে এর বাইরে আর কে সাহস করবে জমিদার বাড়িতে ঢুকতে।

তাহলে চলুন একটু পরে আমরা থানায় যাই। লিস্টটা দিয়ে এই তিনজনের বিরুদ্ধে একটি জিডি করে আসি। যে করেই হোক জিনিসপত্র তো উদ্ধার করতেই হবে। তবে এসব উদ্ধার করতে গিয়ে আপনাকেই ট্রাপ বানাতে হবে আমাদের। আমি আর আপনি যেভাবে বের হলাম এভাবে নয় আপনি একা বের হবেন। আপনাকে তারা ধরে নিয়ে যাবে। আমরা চোর পুলিশের মতো আপনাকে ফলো করে তাদের আস্তানায় চলে যাবো। দেখবেন খুব সহজেই কাজ করা সম্ভব হবে।

মোহন চৌধুরীর মুখে সেই মিষ্টি হাসি। যাক কামিনি রায়ের ছবিটা উদ্ধার হলেই কৃতজ্ঞ থাকবো ছোটকাকু।

ছয়

ইংরেজদের মতো মর্নিং ওয়াকের ড্রেস পরে জমিদার মোহন চৌধুরী নদীর তীরে হেঁটে বেড়াতে বড় ভালোবাসেন। মাথায় হ্যাট, হাতে লাঠি, বুট জুতো পায়ে তিনি সকালবেলা হাঁটতে পছন্দ করেন। কখনো একা একা যান কখনো কেয়ারটেকার ফিরোজ মিয়া কিংবা দারোয়ান জামাল মিয়া তার সাথে থাকে। আজকে তিনি কাউকেই সাথে নেননি একা একা হাঁটছেন। আর দূরে একটি বই নিয়ে ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে ফিরছেন ছোটকাকু। হঠাৎ দূর থেকে চিৎকার শোনা গেল আপনি আমাদের জমিদার আপনি ডিমেনশিয়ার রোগী। আপনি এভাবে হারিয়ে গেছেন, নদীর তীরে এসে পড়েছেন। কোথায় যাচ্ছেন? এরকম নানারকম কথা শোনা যাচ্ছে। একটু পরেই দেখা গেল তিনজন লোক জমিদার মোহন চৌধুরীকে ঘিরে ধরলো। তারা জমিদারকে ধরে নিয়ে একটি অটোতে উঠিয়ে চলে যেতে লাগলো। তারা জোরে জোরে চিৎকার দিচ্ছে আপনি ডিমেনশিয়ার রোগী। আপনার চিকিৎসা প্রয়োজন। আপনি হারিয়ে গেলে বিপদ হবে। আমরা আমাদের জমিদারকে কোথায় পাবো। আপনার মতো গুণী লোক হারিয়ে গেলে আমাদের কি হবে। ছোটকাকু গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখছেন সবকিছু। মোবাইল ক্যামেরায় ভিডিও করলেন। কিছুক্ষণ পরই জমিদার বাড়ি থেকে কেয়ারটেকার এবং দারোয়ান ছুটে এলেন। তারা খবর পেয়ে গেছেন জমিদার মোহন চৌধুরী অপহৃত হয়েছেন।

ছোটকাকু তাদের আশ্বস্ত করলেন তেমন কোনো সমস্যা নেই। আমাদের সোর্স তাদের ফলো করছে। যেকোনো সময়ে তাদের পাকড়াও করা হবে। এদের সাথে যারা বিভিন্ন মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি করেছে তাদেরকেও ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাদের ধরতে না পারলে তো জিনিসপত্র উদ্ধার করা যাবে না। ছোটকাকু কেয়ারটেকারকে সাথে নিয়ে থানায় চলে গেলেন। থানার ওসি নিজাম সাহেব ছোটকাকুকে দেখে হইহই করে উঠলেন। থানায় বসে আছেন ইমরান মন্ডল। ওসি সাহেব ইমরান মন্ডলের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন।

ছোটকাকু ইমরান মন্ডলের সঙ্গে হাত মেলালেন, ওহ আপনিই ইমরান সাহেব?

জ্বি।

আপনি এত সকালে থানায়?

আমাদের জমিদার সাহেবকে অপহরণ করা হয়েছে এজন্যই থানায় আসা।

আপনি এই খবর জানলেন কিভাবে?

আমাকে তো জানতেই হয়। বুঝলেন ছোটকাকু। না জানলে আমি তার ম্যানেজার হলাম কেমনে।

আপনি কি আগে থেকেই জানতেন তিনি অপহৃত হবেন?

না, না তা কিভাবে জানবো? জানতে পারলে তো তাকে নদীর তীরে হাঁটতে পাঠাতাম না।

ওসি নিজাম সাহেবকে বললেন, দ্রুততম সময়ে আশেপাশের এলাকায় রেড দিতে হবে। আপনার সোর্সদের জিজ্ঞেস করুন জমিদার বাবুকে কোনদিকে নিয়ে গেছে। তারা নিশ্চয়ই অপহরণকারীদের ফলো করেছে। ভোলাদ্বিপের চারদিকে ব্লকড দিতে হবে যেন এই দ্বিপের বাইরে নিয়ে যেতে না পারে।

ওসি বললেন, একদম চিন্তা করবেন না, সবকিছু ঠিকঠাক আছে। আমি সব ব্যবস্থা করে রেখেছি। ছোটকাকু বললেন, ওই তিনজনই মনে হচ্ছে প্রধান লোক যারা এ, বি, সি নাম বলেছে। তারাই এইসব অপকর্ম করার চেষ্টা করছে। অলরেডি তারা কিছু দামি বই, কিছু এন্টিক জিনিসপত্র চুরি করেছে। তারা আরও কিছু সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করবে হয়তো। আমাদেরকে সেখানে পাহারা বসাতে হবে। আপনি কিছু ফোর্স পাঠাতে পারেন জমিদার বাড়িতে নাহলে আরও অনেক দামি জিনিস চুরি হয়ে যেতে পারে। সেই সুযোগ তাদেরকে দেয়া যাবে না।

তা তো অবশ্যই। তাদেরকে কোনো সুযোগ দেয়া যাবে নাÑবললেন ওসি নিজাম।

ছোটকাকুদের জন্য চা নাস্তার ব্যবস্থা করলেন। ওসি নিজাম সাহেব, ছোটকাকু, কেয়ারটেকার ফিরোজস মিয়া এবং ইমরান মন্ডল নাস্তা খেতে বসলেন। নাস্তার টেবিলে কলিজা বুনা, পরোটা, মুরগির রেজালা সবই করেছেন ছোটকাকুর সৌজন্যে। সাথে আমেরিকানো কফি। বুঝার কোনো উপায় নেই এটা ভোলা দ্বিপে বসে নাস্তা করছেন।

থানার ওসি হাসতে হাসতে বললেন, নাস্তা দেখে অবাক হচ্ছেন। আসলে অবাক হবার কিছু নেই। এখানকার একটি নরমাল রেস্টুরেন্ট কিন্তু খাবার দাবার অসাধারণ। পুরো ঢাকাইয়া ফিল পাবেন এদের খাবারে। শুনেছি এই রেস্টুরেন্টের মালিক আনোয়ার হোসেন ঢাকায় রেস্টিুরেন্টের ব্যবসা করতেন। করোনায় তার ব্যবসার ক্ষতি হবার কারণে তিনি ভোলাতে এসে একটি রেস্টুরেন্ট দিয়েছেন। বাবুর্চিও ভোলাদ্বিপের ছিল তারা সকলেই এখানে কাজ করেন। তাই খাবারের স্বাদ ঢাকার মতোই। অত্যন্ত জনপ্রিয় এই মায়ের দোয়া রেস্টুরেন্ট। খাবারের মানও ভালো।

ছোটকাকু বললেন, বাহ বেশ ভালো, বেশ ভালো। আরেকদিন সেখানে গিয়ে খাওয়া যাবে তাহলে। দলবল নিয়ে হাজির হবো আনোয়ার এর রেস্টুরেন্টে। আর ওসি সাহেবের নাম করে খেয়ে নেবো বলেই হাহাহা করে হাসলেন। সবাই হোহো করে হেসে উঠলেন। এরমধ্যে ছোটকাকুর কাছে ফোন কল এলো। ছোটকাকু হ্যালো বলতেই ওপার থেকে শুধু বললেন, জমিদার মোহন চৌধুরীকে দেখা গেছে কোতয়াল পাড়ায়।

কে বলছেন?

জমিদার মোহন চৌধুরীর শুভাকাক্সিক্ষ।

কি নাম আপনার?

নাম দিয়ে কি হবে ছোটকাকু? কাজ দরকার তাই না? তিনি খুব উচ্চকণ্ঠে হাসতে হাসতে কোথায় যেন যাচ্ছেন সাথে তিনজন লোক। সবার ধারণা তার ডিমেনশিয়া বেড়েছে। হয়তো এজন্যই তিনি সব ভুলে গেছেন। ভুলতে ভুলতে ভোলাতে তিনি কোথায় যাচ্ছেন কেউ জানে না।

ছোটকাকু পুলিশকে বললেন, জলদি তাকে উদ্ধার করেন। মোহন চৌধুরীকে বাড়িতে নিয়ে আসুন।

কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে জমিদার উধাও হয়ে গেছেন তাকে আর পাওয়া যাচ্ছে না। কোতয়াল পাড়াতে হন্যে হয়ে খুঁজেও তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। অপহরণকারীরা তাকে এত দ্রুত কোথায় নিয়ে গেছে কেউ বুঝতে পারেনি। তাকে ফলো করা পুলিশ সোর্সদেরকে বরখাস্ত করলেন ওসি নিজাম। নতুন করে ফোর্স নিয়োগ দিলেন জমিদার মোহন চৌধুরীকে খুঁজতে। তবে ছোটকাকু বুঝতে পারলেন এটা তেমন জটিল কেস নয়। এরচেয়ে কঠিন কেস তিনি পার করে এসেছেন। এই দ্বিপ থেকে যেহেতু বের হবার কোনো পথ নেই তাই এত বেশি আতঙ্কিত হবার কোনো কারণ নেই। খুব শিঘ্রিই হয়তো এর রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হবে। ছোটকাকু এসব ভাবতে ভাবতেই একটি পিকআপ ভ্যান এসে দাঁড়ালো। থানার ওসি নিজাম সাহেব সেই গাড়িতে উঠে পড়লেন। ছোটকাকু আপনার সঙ্গে আছি আমরা। অতিশিঘ্রই দেখা হবে। জমিদারকে উদ্ধার করবো নো টেনশন।

ইমরান মন্ডল চুপচাপ বসে রইলেন কি করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না। ছোটকাকু ইমরান মন্ডলকে সাথে নিয়ে থানা থেকে বেরিয়ে ভাবছেন কি করে মোহন চৌধুরীকে উদ্ধার করা যায়। তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জমিদারকে যদি অপহরণকারীরা কোনো গোপন কুঠুরীতে নিয়ে যায় তাহলে উদ্ধার করতে সময় লাগবে। ততদিনে মোহন চৌধুরীর মানসিক অবস্থা খারাপ হবে। কারণ বুদ্ধিটা তো ছোটকাকু দিয়েছেন। ছোটকাকু যেভাবে বলেছেন তিনি তো সেভাবেই কাজ করেছেন। সকাল বেলা হাঁটতে গেছেন একা একা। যদিও ছোটকাকু দূর থেকে তাকে ফলো করছিলেন কিন্তু অপহরণকারীরা এত দ্রুত স্থান ত্যাগ করবে সেটা তো ছোটকাকু বুঝতে পারেননি। জমিদার বাড়ির নিরাপত্তার কথাও ভাবতে হচ্ছে। ওসি নিজাম সাহেব যদি ফোর্স না পাঠান তাহলে তো জমিদার বাড়ির এনটিকগুলোকে রক্ষা করা কঠিন হবে। ফাঁকা বাড়ি পেয়ে সুযোগ নিবে সেই অপহরণকারীদের সাঙ্গপাঙ্গরা। ছোটকাকু দেরি না করে দ্রুত ছুটে গেলেন জমিদার বাড়িতে। কারণ ওসির কথাবার্তা কেমন যেন রহস্যময় মনে হয়েছে। তিনি ফোর্স কখন পাঠাবেন সেটাও নিশ্চিত নয়। এমনিতে থানায় অনেক জনবল কম। সারা ভোলাদ্বিপে নানান অপরাধ সংঘটিত হয় সেগুলোই সামাল দেয়ার মতো জনবল থানায় নেই। সে কথা ওসিও বলেছেন। তবুও তার চেষ্টা করা ছাড়া আর কি-ই বা করার আছে। ছোটকাকু জমিদার বাড়িতে এসে কেয়ারটেকারকে দায়িত্ব দিলেন দারোয়ান জামালের নেতৃত্বে লাইব্রেরি সহ বাগানের পাহারা যেন নিশ্চিত করেন। প্রয়োজন হলে কজন বিশ্বস্ত লোক রাখতে হবে। আপাতত জমিদার বাড়ির সব জিনিস রক্ষা তো হোক তারপরেরটা পরে দেখা যাবে।

অর্শা আর সীমান্ত ঘুম থেকে উঠে নাস্তা করে জমিদার বাড়ি ঘুরে ঘুরে দেখছে। অবাক বিস্ময়ে তারা পাথরের মূর্তিগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। এত আগে এত সুন্দর মূর্তি জমিদাররা কিভাবে জোগাড় করলেন এটাও একটা বিস্ময়। শরিফ সিঙ্গাপুরি একাই নদীর পাড়ে হাঁটছেন। সকালের নাস্তাটা তার জন্য ভারি হয়ে গেছে। দৌড়ে যদি পেটের জিনিস না কমাতে পারে তাহলে দুপুরের এত সুস্বাদু খাবার কিভাবে খাবেন সেই চিন্তায় তার মাথা ভার হয়ে যাচ্ছে। এর মাঝেই তাকে দেখে কয়েকজন ছেলেমেয়ে মোটকু মোটকু বলে চিৎকার দিয়ে উঠলো। শরিফ সিঙ্গাপুরি মনটা খারাপ করে বালুতে বসে পড়লেন। এমনও হয় এখানে। কত জেলা ঘুরলেন তিনি কেউ এই ধরনের কথা বলেনি। সে একটু স্বাস্থ্যবান বটে তবে এরকম বডি শেমিংয়ের শিকার তিনি কোথাও হননি। ছোটকাকুকে ব্যাপাররটা জানাবেন বলে বিড়বিড় করতে লাগলেন। হঠাৎ একটি ছেলে কণ্ঠ ভেসে এলো এই তোরা কি করছিস এসব বলতে নেই। তিনি হয়তো আমাদের এই ভোলাদ্বিপের মেহমান। মেহমানকে এভাবে অপমান করতে হয় না।

চিৎকার করে উঠলেন শরিফ সিঙ্গাপুরি। হা হা আমি এই দ্বিপের মেহমান। আমাকে অপমান করা মানে পুরো দেশকে অপমান করা। আমার মতো স্বাস্থ্যবানদের অপমান করা। স্বাস্থ্য সৃষ্টিকর্তার দান। কত মানুষ স্বাস্থ্য বানানোর জন্য কত রকম ওষুধ খায় এটা কি তোমরা জানো বাচ্চারা? নদীর তীর ধরে হাঁটতে হাঁটতে জমিদার বাড়ির দিকে রওনা দিলেন শরিফ সিঙ্গাপুরি।

জমিদার বাড়ির কেয়ারটেকার ছোটকাকুকে আশ্বাস দিলেন অপরিচিত কাউকেই জমিদার বাড়িতে প্রবেশ করতে দেয়া হবে না। ছোটকাকু সবাইকে নির্দেশ দিয়ে বাড়ির বাইরে আসতেই গেটে একটি চিরকুট পেলেন। কাগজের ভাজ খুলে ছোটকাকু চিরকুটটি পড়লেন। সেখানে লেখা রয়েছে জমিদার মোহন চৌধুরী সুস্থ আছেন নিরাপদে আছেন কোনো টেনশন করবেন না। আমরা শুধু তার সংগ্রহশালা থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু জিনিস সংগ্রহ করতে চাই। এগুলো বাজারে অনেক দামি। তাই তো তাকে ডিমেনশিয়ার রোগী বানিয়ে আমরা ঘুরে বেড়াচ্ছি। চিরকুটটি পড়ে ছোটকাকু হাসলেন। একথা তো সবাই জানে যে তাকে ডিমেনশিয়ার রোগী বানানো হয়েছে। আসলে তিনি তা নন। সবই তার মনে আছে। তিনি মানসিকভাবে সুস্থ সবল একজন মানুষ। স্মৃতি একদম ভালো। তাকে পেলেই সব রহস্যের সমাধান হবে। এই ভোলা দ্বিপে জমিদার এসেছিলেন কয়েকদিন নিরিবিলি কাটাবেন আর পৈতৃক বাড়িটি দেখবেন অনেকদিন পর। নিজের ছেলেবেলার স্মৃতিমন্থন করবেন। কিন্তু তা আর হলো কই। কিন্তু তা না করে তাকে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে। বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে তার সাথে প্রতারণা করছেন। তবে জমিদার একটুও ভয় পান না। মনের আনন্দে এসব উপভোগ করেন।

সাত

ভুলতে ভুলতে ভোলাতে

কাঁকড়া আছে ঝোলাতে

বেলুন টেলুন ফোলাতে

মাথায় হাত ভোলাতে

দরজা টরজা খোলাতে

বাপে মায়ে পোলাতে

ভুলতে ভুলতে ভোলাতে...

এটা একটি বিচিত্র ছড়া। প্রায় দেড়শো বছর আগে লেখা। এই ছড়াটি হয়তো কোনো বুড়িমা লিখেছিলেন। ছোটকাকু একটা বই ঘাটতে ঘাটতে ছড়াটি পেলেন। ছড়াটি পড়ে মুখস্ত করে হাঁটতে লাগলেন ছোটকাকু ভোলা শহরের মধ্য দিয়ে। লোকজন অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। তারা ভাবছে এ আবার কোন জমিদার।

ভুলতে ভুলতে ভোলাতে, কাঁকড়া আছে ঝোলাতে... কিছুক্ষণের ভেতর দেখা গেল ভোলার ছেলেমেয়েদের কণ্ঠে এই দুই লাইন ছড়া সবার মুখে মুখে।

ভুলতে ভুলতে ভোলাতে... ছোটকাকুও তাদের সাথে তাল মিলিয়ে ছড়াটি বলছেন। হাত পা নাড়িয়ে ছড়াটি বলে বেড়াচ্ছেন। সন্ধ্যা নামি নামি করছে এমন সময় হঠাৎ একটি পুরনো বাড়ির জানাল থেকে শব্দ কানে এলো ছোটকাকুর।

ভুলতে ভুলতে ভোলাতে

কাঁকড়া আছে ঝোলাতে...

কান খাড়া করলেন ছোটকাকু। আরে এতো মোহন সাহেবের কণ্ঠস্বর! সঙ্গে থাকা ছেলেপেলে নিয়ে ছোটকাকু দ্রুত সেই বিল্ডিংয়ের দোতলায় উঠলেন। দরজা ধাক্কা দিলেন কিন্তু ভুলতে ভুলতে ভোলাতে ছাড়া আর কিছু শোনা গেল না। দরজাও ভেতর থেকে বন্ধ। কিছুতেই খোলা যাচ্ছে না। ছোটকাকু বুদ্ধি করলেন... পকেট থেকে একটি চাকু বের করে দরজার মাঝখান দিয়ে ছিটকিনি খুলে ফেললেন আর অমনি বুকের ওপর এসে ঝাঁপিয়ে পড়লেন জমিদার মোহন চৌধুরী।

তিনি শুধু বলছেনÑভুলতে ভুলতে ভোলাতেÑকাঁকড়া আছে ঝোলাতে

ছোটকাকুকে তিনি জানালেন এ বি সি কিন্তু এই বাড়ির আশেপাশেই আছে।

তাই নাকি! আমারও তাই মনে হয়। ওরা ধরা পড়ে যাবে। জিনিসগুলো যেন ভোলাদ্বিপের বাইরে যেতে না পারে আমি সেই চেষ্টাই করছি।

খুব ভালো খুব ভালো এ বি সিকে ধরতে পারলেই এসব ব্যাপারে তথ্য পাওয়া যাবে।

তা অবশ্য ঠিক বলেছেন। তবে ওদেরকে না ধরে আপাতত জিনিসগুলোকে রক্ষা করি তারপর তাদেরকে দেখা যাবে। ছোটকাকু ছেলেপেলেদের নিয়ে মোহন চৌধুরীকে সাথে নিয়ে সেই পুরনো বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন। মোহন চৌধুরী ডানে বায়ে তাকালেন। কেউ কোথাও তাকে ফলো করছে কিনা কে জানে। না কাউকে কোথাও দেখা গেল না। ছোটকাকু একটি রিকশা ডেকে মোহন চৌধুরীকে সাথে নিয়ে মনের আনন্দে জমিদার বাড়ির দিকে রওনা দিলেন। বাড়ির ভেতর ঢুকতেই দেখেন গেটের ভেতরে ডান পাশে একটি আবক্ষ ভাষ্কর্য ছিল সেটি নেই। সাদা পাথরের তৈরি সেই ভাষ্কর্যটি অত্যন্ত দামি। কোথায় গেল সেই ভাষ্কর্যটি! মোহন চৌধুরী মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন। কোকড়া চুলের একটি নারী ভাষ্কর্য। এটি মোহন চৌধুরীর দাদা ফ্রান্স থেকে এনেছিলেন বলে জানা যায়। জমিদার চিৎকার দিলেন। দৌড়ে হাজির হলেন কেয়ারটেকার তার সাথে দারোয়ান।

জমিদার চিৎকার দিলেন কোথায় থাকো তোমরা আমার বাড়ির সব চুরি হয়ে যাচ্ছে দেখতে পাও না নাকি? তাহলে মোহন চৌধুরীকে অপহরণ করে আমাদেরকে অন্যদিকে মুভমেন্ট করিয়ে এটা চুরি করা হয়েছে।

মন খারাপ হলো ছোটকাকুর তিনি বারবার বলেছেন বাড়ির পাহারা জোরদার করতে কিন্তু কিছুই হয়নি। ওসি সাহেবও কোনো ফোর্স পাঠাননি। আসলে এই বাড়ির ব্যাপারে অনেকেরই অবহেলা মনে হচ্ছে। কেউ তেমন গুরুত্ব দিচ্ছেন না। ছোটকাকুকেই ভূমিকা নিতে হবে। সবাইকে সাবধান হতে বলার পরও কেউ বুঝলো না ভাষ্কর্য কিভাবে চুরি হলো। আসলে এই বাড়িতে যারা আছেন তারা ভাবেতই পারছেন না এই বাড়ির প্রতিটি জিনিস কত মূল্যবান। অথবা এই বাড়ির দায়িত্বে যারা আছেন তাদের ভেতর কেউ চুরির সঙ্গে জড়িত থাকলেও থাকতে পারেন। এই সন্দেহ উড়িয়ে দেয়া যায় না। ভেতরেই কোনো গলদ রয়েছে নাহলে এই নারী ভাষ্কর্যটি যাবে কোথায়? সবাই তো বাড়ি পাহারা দিচ্ছে।

কেয়ারটেকারকে ডেকে ছোটকাকু ধমক দিলেন। আপনি তো এ বাড়ির পুরনো লোক সবকিছু বোঝেন অনেকের মন মানসিকতা কি সেটাও জানেন তাহলে কাকে কোথায় দায়িত্ব দিতে হবে সেটাও তো আপনি বুঝতে পারছেন তাই না। আপনাকে আরও সচেতন হতে হবে হে...আপনার যদি দায়িত্ব নিয়ে কাজ না করেন তাহলে বাকি জিনিসগুলো চুরি হয়ে যাবে। জমিদার বাড়ির সম্মান রক্ষা করা যাবে না। ছোটকাকু সন্ধ্যার চা খেতে খেতে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবছেন চোখের সামনে জমিদার বাড়ির সবকিছু চুরি হয়ে যাচ্ছে। কিছুই করতে পারছেন না। একটার সমাধান করতে গিয়ে আরেকটা সমস্যা এসে হাজির হচ্ছে। এই জিনিসগুলোর সমঝদার তো আলাদা। অন্যকোনো গ্রুপ কাজ করছে না তো? নাকি শুধুই এবিসি নিয়েই আমরা এগুবো। যারা এই জিনিসের কদর বোঝে এমন মানুষ ছাড়া এইসব দামি এন্টিক কে বা কারা নেবে। ছোটকাকু একটু চিন্তা করলেন। এগুলোকে রক্ষা যায় কিভাবে তাহলে! তিনি জানালেন এখন থেকে এই বাড়ি পাহারা তারা দিবেন। কোনো অপরিচিত মানুষকে এলাও করা হবে না। বাড়ির চারপাশে কেউ আনগোনা করলে তাকে পাকড়াও করা হবে। ছোটকাকু বললেন ঠিক আছে।

মোহন চৌধুরী বললেন, আহা আরও আগে যদি আপনারা আসতেন তাহলে আমার সাদা পাথরের মূর্তিটি চুরি হতো না। ছোটকাকু মনে মনে ভাবলেন এই বাড়ির ভেতরে আবার চোরদের কেউ আছে কিনা সেটাও তো ভাবার বিষয় এখন তিনি কাউকেই আর সন্দেহের বাইরে রাখতে পারছেন না। মোহন চৌধুরীর মনটা ভীষন খারাপ। গেটের সামনের ভাষ্কর্যটি চুরি সহজেই বুঝা যাচ্ছে কিন্তু বাগানের মাঝখানে কোনো মূর্তি চুরি হলে সেটা তো সহজে বুঝা যাবে না। এটা বুঝাও সম্ভব নয়। অনেকদির পর আসার জন্য অনেক কিছুই তার নখদর্পনে নেই। বিশেষ করে লাইব্রেরি তার প্রিয় হওয়ার কারণে সেখানে তিনি বেশি সময় কাটান। পুকুরের ভেতরে মাছের আদলে কিছু কাসার মূর্তি ছিল সেখানে কিছুটা ফাঁকা মনে হচ্ছে। আল্লায় জানে সেখান থেকে কিছু চুরি হলো কিনা। ভীষণ মন খারাপ করেছেন তিনি। এই ভোলাদ্বিপকে কত নিরাপদ ভাবেন জমিদার মোহন চৌধুরী। তার বিশ্বাসে চিড় ধরে গেল। পুকুরের ভেতর যে দুটি পিতলের মূর্তি আছে এগুলো অত্যন্ত দামি মূর্তি। জানা যায় রাজা অশোকের আমলের পিতলের কলসি এগুলো। মোহন চৌধুরীর দাদার সাথে রাজা অশোকের বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল রাজা অশোক এই পিতলের কলসি উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন। আর বলেছিলেন এই কলসি যতক্ষণ পুকুরে থাকবে ততক্ষণ পুকুরে মাছ থাকবে। এই মিথ চালু আছে পুরো ভোলাদ্বিপে।

ছোটকাকু বললেন যা নেই তা তো নেই। শুধু মন খারাপ করে লাভ কি। চলুন আবারও চা খাই। আপনার সেই প্রিয় চা। আর নিজেদের মতো গল্প করি।

মোহন চৌধুরী বললেন, তিনি প্রথম লন্ডন গিয়েছিলেন ১৯৫৩ সালে। টানা একমাস সেখানে তিনি অবস্থান করেছিলেন। তিনি ঘুরে বেড়িয়েছিলেন লন্ডনের বিভিন্ন জায়গায়। সামনে কোনো এন্টিক টাইপের জিনিস পেলেই তিনি সংগ্রহ করতেন। অনেককিছু কিনে জাহাজে করে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন কলকাতায়। আহা সেইসব জিনিস এখন খোয়া যাচ্ছে চুরি হচ্ছে। তার মনে অনেক কষ্ট জমা হচ্ছে। কাকে তিনি এই বেদনার কথা বলবেন? ছোটকাকুকে তিনি বললেন এগুলোর প্রতি আমার অবিশ্বাস্য প্রেম। আমি আমার সন্তানের মতো ভালোবাসি এই এন্টিকগুলোকে। কত যতœ করে রাখি এদের। কিন্তু সেই সন্তানগুলোকে কে বা কারা যে চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। আমার পূর্ব পুরুষের স্মৃতি এগুলো। এই স্মৃতিগুলোকে রক্ষা করা আমার দায়িত্ব। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এরা থাকবে। আমাদের জমিদারির সাক্ষ্য দিবে।

ছোটকাকু বললেনÑহারিয়ে যাচ্ছে তা নয় আমরা চেষ্টা করছি কোনো জিনিস যেন খোয়া না যায়। আমাদের উপর ভরসা রাখুন সবকছিু উদ্ধার হবে আপনাদের জমিদারির এই স্মৃতি থাকবে। পূর্ব পুরুষের এই স্মৃতি নষ্ট হতে দেয়া যাবে না। আশা করি সব উদ্ধার হবে আসামীও ধরা পড়বে।

আহা তাই যেন হয়, তাই যেন হয় বলে আক্ষেপ করে উঠলেন জমিদার মোহন চৌধুরী।

আট

জমিদার মোহন চৌধুরী বললেন, ছোটকাকু নার্ভাস হবেন না। আপনাকে একটি এন্টিক জিনিস দিয়ে দেবো।

কী যে বলেন জমিদার সাহেব। আমার এসব উপহার লাগবে না। আপনার সম্মান যেন থাকে সেই চেষ্টা করছি আমাকে আগে সফল হতে দিন। আমি সবকিছু উদ্ধার করে আপনার সংগ্রহশালাতে রাখতে চাই।

নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই বললেন মোহন চৌধুরী। আমরা আমাদের সংগ্রহশালাকে রক্ষা করতে চাই ছোটকাকু। আপনি সেই ব্যবস্থা করে দিয়ে যাবেন নিশ্চয়ই।

অবশ্যইÑবললেন ছোটকাকু। আপনার এইসব উদ্ধার করার পর এগুলোর ভবিষ্যত কি হবে? মোহন চৌধুরী জানালেন এগুলোর ভবিষ্যত খুব উজ্জ্বল। জমিদারিত্বের এইসব স্মৃতি রক্ষায় সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে দেবো। এটি একটি জাদুঘর বানানো হবে। যেগুলোর দায়িত্বে সরকার নিজে থাকবে কি বলেন ছোটকাকু?

বাহ ভালো প্রস্তাব। আমিও সরকারের প্রতœতত্ব অধিদপ্তরের সাথে যোগাযোগ করে দেখবো। এখানে একটি জাদুঘর হলে মন্দ হবে না। জমিদারদের স্মৃতিও রক্ষা হবে আবার নতুন প্রজন্ম এসব ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হবে। ভোলাদ্বিপ চমৎকার একটি নিরিবিলি দ্বিপ। এই দ্বিপে তেমন ভিড় নেই। জনগণ কাজ করে আর খায় দায় ঘুরে বেড়ায়। এখানকার অধিকাংশ মানুষের পেশা মৎস্য আহরণ করা। কৃষি জমিতে চাষবাস করা। যারা কৃষি কাজ করেন তারা সারাদিন কাজ সেরে সন্ধ্যেবেলায় টং দোকানে বসে আড্ডা দেয়, সিনেমা দেখে, গল্প করে। এইসব আড্ডা চলে অনেক রাত পর্যন্ত। নারীরা গৃহকর্মে ব্যস্ত থাকে। শিক্ষার্থীরা স্কুল কলেজে লেখাপড়া করে। এখানে বাজারে একটি ছোট্ট লাইব্রেরি আছে তবে বইয়ের সংখ্যা একেবারেই কম। ছোটকাকু সেদিন একঝলক ঢুকেছিলেন কিন্তু তেমন সময় দিতে পারেননি। তিনি ভাবছেন জমিদার বাড়ির কাজ সেরে লাইব্রেরিতে যাবেন। লাইব্রেরির জন্য ভালো ভালো অনেক বই পাঠাবেন। এখানকার ছেলেমেয়েরা উপকৃত হবে তাদের জ্ঞানভান্ডার সমৃদ্ধ হবে। জমিদারদের লাইব্রেরিতে তো সাধারণ মানুষ প্রবেশ করতে পারে না এটি একটি এন্টিক লাইব্রেরি। সাধারণের আনাগোণা বাড়লে এন্টিকগুলি চুরি হবার সম্ভাবনা রয়েছে তাই এখানে সর্ব সাধারণের যাতায়াত নিষেধ। জমিদার মোহন চৌধুরী অত্যন্ত সজ্জন একজন মানুষ। তিনি এখানকার মানুষের জন্য সুপেয় পানির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। দ্বিপের বেশ কয়েকটি জায়গায় তিনি গভীর নলকূপ বসিয়ে দিয়েছেন যেন সাধারণ মানুষ সুপেয় পানি পান করতে পারেন। এখানকার স্কুল কলেজগুলোতেও তার এবং তার পরিবারের যথেষ্ট অবদান রয়েছে। স্কুল কলেজের ভবন নির্মাণ করে দিয়েছেন। বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল জাদুঘরের মেরামত করেছেন। এই জাদুঘরে মুক্তিযুদ্ধের অনেক স্মৃতি সংরক্ষিত রয়েছে। বিকেল হলে অনেকেই এই জাদুঘর পরিদর্শনে যান।

ছোটকাকু বললেন, চলো আগামীকাল আমরা একটু পুরো ভোলা ঘুরে দেখবো।

সকালবেলা সবাই মিলে হইহই করতে করতে বেরিয়ে পড়লেন। ছোটকাকুর অনেক দিনের ইচ্ছে ছিল চর কুকরিমুকরি দেখবেন সেটাই হলো তারা চলে গেলেন চর কুকরিমুকরি। এখানে বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য। বিশেষ করে হরিণের বিচরণের জন্য বিখ্যাত। চমৎকার জায়গা এটি। বলা হয় ভোলাদ্বিপের সবচেয়ে পরিচিত জায়গা এটি। শরিফ সিঙ্গাপুরি তো অবাক।

তিনি বললেন, আমি সিঙ্গাপুরের অনেক জায়গায় গিয়েছি কিন্তু এত সুন্দর জায়গা কোথাও নেই। আমাদের বাংলাদেশ ছাড়া এই সৌন্দর্য কোথাও দেখা যায় না। আসলেই পুরো বাংলাদেশ আমাদের ঘুরে ঘুরে দেখা প্রয়োজন। নাহলে আত্মা অতৃপ্ত থেকে যাবে।

ছোটকাকু বললেন, ঠিক তাই। বাংলার প্রতিটি প্রান্তেই ছড়িয়ে রয়েছে অপরূপ সৌন্দর্য।

অর্শা তো লাফ দিয়ে একটি হরিণকে ধরতে গেল হরিণটি দৌড়ে পালালো। সীমান্ত উদাস হয়ে কবির কতো করে গাইছেÑএকী অপরূপ রূপে মা তোমার হেরিণু বঙ্গ জননী।

এর পাশেই মনপুরা দ্বিপ। মেঘনার বুকে জেগে ওঠা এক টুকরো ছোট দ্বিপ এটি। এই দ্বিপ থেকে সূর্যোদ্বয় এবং সূর্যাস্ত দেখা যায়।

ছোটকাকু বললেন, আজ আমরা এখান থেকে সূর্যাস্ত দেখবো।

তাই হলো ছোটকাকু আর তার দলের সদস্যরা সূর্যাস্ত দেখে ফিরলেন জমিদার বাড়িতে। রাতে ডিনারের আয়োজন করেছেন জমিদার মোহন চৌধুরী নিজে। তিনি মেনু ঠিক করেছেন। নদীর বড় বোয়াল মাছ এনেছেন। বড় চিংিড়ি মাছ। খাশির মাংস। খাশির মাংসের কোর্মা খুব পছন্দ করেন জমিদার মোহন চৌধুরী। তার জন্য স্পেশাল কোর্মা করা হয়।

শরিফ সিঙ্গাপুরি বলে উঠলেন, আহ আমার তো জিভে জল চলে এলো। এই প্রথম আমি খাসির কোর্মা খাচ্ছি।

ছোটকাকু মুচকি হাসলেন। সিঙ্গাপুরি সাহেব আপনি তো ঢাকাতেও কিন্তু খাসির কোর্মা খেয়েছেন।

আরে সেটা তো ঢাকায়। ঢাকা আর ঢাকার বাইরের খাবারের আলাদা স্বাদ আছে বুঝলেন ছোটকাকু। এখানে সবই প্রাকৃতিক। এই যে ধরুন বোয়াল মাছ। নদীর টাটকা তাজা বোয়াল। আপনি কি ঢাকাতে এটা পাবেন?

না, তা পাবো নাÑবললেন ছোটকাকু।

ঢাকাতে যা পাবেন সেটা ফ্রোজেন। এই টাটকা মাছকে বরফ দিয়ে ঢাকায় নেয়া হয়। অনেক সময় পচনও ধরে। কি আর করা আমরা তো সেটা খেয়েই তৃপ্তির ঢেকুর তুলি। এই যে দেখুন নদীর বড় চিংড়ি। এই চিংড়ি আমি জীবনেও দেখিনি। কি স্বাদ বাপরে...

অর্শা বলল, সিঙ্গাপুরি সাহেব একবার আমাদের বাসায় কিন্তু নদীর টাটকা চিংড়ি খেয়েছিলেন মনে আছে? আমার বান্ধবী আদিবা পাঠিয়েছিল। আদিবার বাবার তো লঞ্চের পাশাপাশি মাছের ব্যবসাও আছে। বরিশালে তাদের বিশাল মাছের আড়ত রয়েছে। কয়েকটি ব্যবসার সঙ্গে তার বাবা জড়িত।

সিঙ্গাপুরি হাসলেন। সেটা মনে আছে তবে এই যে একেবারে তাজা চিংড়ি ধরে এনে রান্না করা এটা তো তুমি ঢাকাতে পাবা না অর্শা।

হুম..

আচ্ছা সিঙ্গাপুরি সাহেব বলুন তো আপনি সিঙ্গাপুরে কি এরকম মাছ পেয়েছেন?

না, না কোথায় পাবো। এটা আমাদের বাংলাদেশেই সম্ভব। বিশেষ করে ভোলাদ্বিপের কথা না বললেই নয়। আমরা যদি ভুল করে ভোলাতে না আসতাম তাহলে এই খাবারের স্বাদ কি পেতাম? এটাও আমাদের জন্য আশীর্বাদ বলা যায়।

জমিদার মোহন চৌধুরী বললেন, ছোটকাকু যদি চান তাহলে আমি এখান থেকে টাটকা মাছ ঢাকাতে পাঠিয়ে দেবো। কোনো কেমিকেল দেয়া হবে না। শুধু বরফ দিতে হবে। নাহলে তো তাজা মাছ পাঠানো যাবে না।

সিঙ্গাপুরি বললেন, ওই একই কথা তাজা মাছ তো পবো না।

মুচকি হেসে ছোটকাকু বললেন, এক কাজ করা যায় না, আপনাকে এখানে রেখে যাই। আপনি এখানে মাছের ব্যবসা করবেন আর আমাদের জন্য টাটকা মাছ পাঠাবেন।

না বাপু এখানে আমি একা থাকতে পারবো না। এখানকার দুষ্টু পোলাপান যেভাবে সেদিন আমার পিছু নিয়েছিল....

আসলে এরা আপনার মতো কাউকে এই দ্বিপে দেখেনি তো তাইÑবলল অর্শা।

তবে নদীর পাড়টা অনেক সুন্দর। হাঁটতে কী যে ভালো লাগেÑবললেন, শরিফ সিঙ্গাপুরি।

এই নদীই বর্ষাকালে ফুলে ফেঁপে ওঠে। তখন অনেক ভয়ানক রূপ ধারণ করে সিঙ্গাপুরি সাহেবÑবললেন ছোটকাকু। আর যদি ঝড় হয় তাহলে তো কথাই নেই। মানুষকে তখন নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য আশ্রয়স্থল খুঁজতে হয়। এখানে কিন্তু ১৯৭০ সালের গোর্কীতে অনেক মানুষ মারা গিয়েছিল।

হা সেটা শুনেছিÑবললেন সিঙ্গাপুরি। আমি এখানে থাকবো না আমার ঝড়ের খুব ভয়..

আপনাকে ঝড়ে উড়িয়ে নিতে পারবে না বলেই হেসে উঠলো অর্শা সকলেই হোহো হো করে হেসে উঠলেন।

নয়

খাবার শেষে সবাই মিলে ছাদে উঠলেন। চমৎকার সাজানো গোছানো ছাদ। একপাশে দুটি ঘর তোলা সেখানে কয়েকজন বৃদ্ধা থাকেন। তারা অনেকদিন ধরেই এখানে বাস করছেন। জমিদার মোহন চৌধুরী তাদের তদারকি করেন। ঠিকমতো খাবার দেয়া হলো কিনা। কারো কোনো অসুখ হলে ঠিকমতো চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে কিনা সব খবরই তিনি রাখেন। কারো কোনো বড় অসুখ হলে ঢাকাতে নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থাও করেন জমিদার মোহন চৌধুরী। এখানকার সকলেই মোহন চৌধুরীকে ভালোবাসেন। বাবার আদর্শকে ধরে রেখেছেন তিনিও। মোহন চৌধুরীর দাদা এই বাড়ি তৈরি করেছিলেন। তিনি এখানে নির্জন দ্বিপে এসে বসতি গড়েছিলেন। তার শখ ছিল এন্টিক জিনিসের একটি জাদুঘর করবেন। সেই উদ্দেশেই তিনি এখানে বাড়ি বানিয়েছিলেন। এখানকার মানুষের সরলতায় তিনি মুগ্ধ হয়ে ভেবেছিলেন এখানে একটি বাড়ি করলে সবকিছু নিরাপদ থাকবে। এরা এন্টিকের প্রতি লোভ দেখাবে না। কিন্তু এখন যেন সব ঘটনা ঘটছে সেটা এখানকার মানুষের কাজ নয় বলেই মন্তব্য মোহন চৌধুরীর। তার ধারণা বাইরে থেকে এসে কেউ এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে। এখানকার মানুষজনকে তিনি চেনেন এরা এসব কাজ করতে পারেন না বলেই তিনি সব সময় বিশ্বাস করেন। বাইরের মানুষের প্রলোভনে পড়ে হয়তো স্থানীয় কিছু লোক যোগ দিলেও দিতে পারে। তবে তারা তাদের ভুল বুঝতে পারবে বলে তিনি মনে করেন। তারা তাদের ঐতিহ্য রক্ষা করবেন। এটা তো জামিদারদের ব্যক্তিগত সম্পদ নয় এলাকার সম্পদ। এগুলো ভোলাদ্বিপের সম্পদ। আমরা আর কতদিন। এভাবে ব্যক্তিগতভাবে তো পাহারা দিয়ে সম্পদ রক্ষা করা যায়? এইসব জিনিসের মর্যাদা যারা দিতে পারবে তারাই জমিদার বাড়ির প্রিয়জন। তিনি জানান আমার পরম সৌভাগ্য যে অলৌকিকভাবে এই সময়ে ছোটকাকু এসেছেন এই ভোলাদ্বিপে। জমিদার মোহন চৌধুরীর দাদা ছাড়াও তার বাবা এবং মোহন চৌধুরী নিজেও অনেক জিনিস সংগ্রহ করেছেন। বলা যায় বংশ পরম্পরায় এই সংগ্রহ চলে আসছে। ছাদে ওঠার সময়েই কারা দৌড়ে পালালো। মোহন চৌধুরী চিৎকার দিলেন চোর চোর... কিন্তু কেউ বোঝার আগেই তারা একতলার ছাদ থেকে লাফ দিয়ে দৌড়ে পালালো। কেয়ারটেকার কিংবা পাহারাদার কেউই তাদের ধরতে পারলো না।

ছোটকাকু শুধু বললেনÑচারদিকে তাদের লোকজন। কি হবে কে জানে। আমরা কতটুকু সফল হবো সেটা সময় বলে দিবে। এর মাঝে হইহই শব্দ বাইরে। দৌড়ে পালানোর সমেয় একজনকে ধরে ফেলেছে পুলিশ। পুলিশ সদস্য শামীম সে লাফ দিয়ে দেয়াল টপকে চোরের ওপর পড়েছে। ঘাড় ধরে ভেতরে নিয়ে এসে। বাইরে তাই জটলা বেঁধেছে। ছোটকাকু সহ মোহন চৌধুরী নিচে নেমে গেলেন দ্রুতবেগে। কাকে ধরে নিয়ে এসেছে দেখতে হবে। তাকে বাই একটি খুঁটির সাথে বেঁধে ফেলেছে পুলিশ সদস্যরা। কয়েকটি কিল ঘুষিও মেরেছে তারা।

ছোটকাকু বললেন থামো তোমরা আমি দেখছি ব্যাপারটা। আচ্ছা তুমি কোত্থেকে কিভাবে এলে বলো তো।

আমি বরিশালে একটি দোকানে কাজ করতাম।

এখানে এলে কিভাবে?

আমাকে পাহারাদারের চাকরি দিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে সাতদিনের জন্য।

তুমি তো পাহারদার নও চুরির জন্য এসেছ তাই না?

না, স্যার চুরি বলবেন না। কিছু জিনিস এখান থেকে সরিয়ে নেয়ার জন্য আমাদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

তুমি আর কে এই কাজে দায়িত্ব পেয়েছ বল তো।

আমার সাথে আরেকজন আছে কিন্তু সে তো পালিয়েছে।

কিবাবে পালালো তাকে কি এখন পাওয়া যাবে না?

জ্বি না স্যার সে তো পালিয়েছে তাকে আর পাওয়া যাবে না।

তাহলে? তুমি এখন সব খবর দেবে আমাদেরকে। এখান থেকে যেসব জিনিস চুরি হয়েছে সেগুলো কোথায় নিশ্চয়ই তুমি জানো।

না স্যার, এখান থেকে আগে যেসব জিনিস হারিয়েছে সেসব ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না। তবে আমরা কিছু জিনিস সরিয়েছি।

তা সেগুলো কোথায়? ছোটকাকু চিৎকার করে উঠলেন।

এই বাড়িতেই রেখেছি।

চলো তো দেখি কোথায় রেখেছ সেসব।

তার পিছমোড়া হাত খুলে দেয়া হলো তবে হাতে রশি দিয়ে বাঁধা। লোকটি নিয়ে গেল সিঁড়িঘরের পাশে। সেখানে একটি বাক্সে পরিসিলিনের গ্লাস, বাটি, মগ।

এগুলো কি তুমি সরিয়েছ?

আমতা আমতা করে লোকটি বলল জ্বি স্যার।

কি করবে এগুলো?

ঢাকা শহরে নিয়ে যাবো। বিক্রি করবো। ওখানে এগুলো কেনার লোক আছে। অনেক টাকা পাবো।

আর কি নিয়েছ এখান থেকে?

না স্যার আর কিছু নেইনি।

আর তোমার বন্ধু?

না, সেও কিছু নিতে পারেনি। মাত্র তো আমরা কাজ শুরু করেছি।

আর কে কে আছে তোমাদের সাথে? কে এনেছে তোমাদের?

শুনেছি এখানকার কেউ কেউ আছে।

কারা তারা?

জানি না স্যার।

ঠিকই জানবে। দু চারটে ঘা দিলেই বুঝবে। বলেই ছোটকাকু কেয়ারটেকারকে বললেন ওকে বেঁধে কয়েক ঘা দিন দেখবেন সব বেরিয়ে আসবে।

আদেশ পেয়ে কেয়ারটেকার লোকটিকে বারান্দার খুঁটির সঙ্গে বেঁধে নিয়ে কয়েকটি বাড়ি মারলেন।

তখন লোকটি মা গো বাবাগো বলে চিৎকার করতে লাগলো। আচ্ছা বলছি বলছি বলে চিৎকার দিলো। লোকটি তার পরনের জামার নিচ থেকে দুটি বই বের করে দিলো। এই বই দুটি এন্টিক বই। অনেক দামি বই।

তুমি চিনলে কিভাবে এটা দামি বই?

আমি তো চিনি না। আমাকে ভিডিও কলে দেখানো হয়েছে কোন বই নিতে হবে।

তুমি যে নাম্বারে কথা বলেছ সেই নাম্বারটা দাও। ছোটকাকু মোবাইল নাম্বার নিয়ে কল দিলেন কিন্তু কল হলো কেউ ধরলো না। আন্তর্জাতিক কল হয়ে যাচ্ছে। বোঝা যাচ্ছে মোবাইলটি দেশের বাইরে আছে। ছোটকাকু ভাবলেন এরা তো আন্তর্জাতিক চোর সিন্ডিকেট মনে হচ্ছে। দেশের বাইরেও এদের যোগাযোগ। অর্থাৎ দেশের জিনিস নিয়ে বিদেশে পাচার করে। রাতে খুব সতর্ক সবাই। আজ রাতে অনেক কিছু ঘটতেই পারে। কারণ তাদের সিন্ডিকেটের একজন ধরা পড়েছে। রাতে সবাই খুব সতর্কভাবে থাকতে হবে। অর্শা আর সীমান্ত লাইব্রেরির দায়িত্বে। স্পেশাল চা আর বিস্কুটের ব্যবস্থা করা হয়েছে যেন ঘুম না আসে। ছোটকাকু আর মোহন চৌধুরী সিঁড়ি ঘরের কাছে সাথে কেয়ারটেকার। বাইরে পুলিশের সতর্ক অবস্থান। হঠাৎ মধ্যরাতে হইহই শব্দ। একজন অপরিচিত লোক বাইরের একটি গাছ বেয়ে ছাদের উঠেছিল। পাহাদার একজন তাকে ধরে ফেলেছে। লোকটি ভালো করে কথা বলতে পারে না। কেউ তাকে চেনে না। পুলিশ সদস্যরা তাকে বেঁধে মারধর করতে লাগলো। কিন্তু সে কথা বলতে পারে না। যতই মারে সে শুধু তোলাতে থাকে।

কেয়ারটেকার ফিরোজ মিয়া এসে বললেন আরে এতো ভোলাদ্বিপের তোতলা মিয়া। সে তো কথা বলতে পারে না। তোতলাতে থাকে। সবাই তাকে চেনে তোতলা মিয়া নামে। কেয়ারটেকার জানালো তার সাথে আস্তে আস্তে কথা বলতে হবে। সে আস্তে কথা বললে কিছু বোঝা যায়। তাকে বেঁধে রাখা হলো। আকাশে তখন চাঁদ উঠেছে। জোছনায় ভেসে যাচ্ছে পুরো ভোলাদ্বিপ। দূরে মেঘনা নদীর ঢেউ আছড়ে পড়ছে কুলে। চমৎকার আবহাওয়া।

ছোটকাকু বললেন, সকাল হোক তারপর তাকে জেরা করা যাবে। সবাই সতর্কভাবে পাহারা দিতে থাকুন।

দশ

সূর্য উঠেছে। চমৎকার সকাল। হালকা ঠান্ডা বাতাস বয়ে যাচ্ছে। ছোটকাকু সহ সকলেই ফ্রেশ হয়ে নাস্তার টেবিলে বসলেন। দ্রুত নাস্তা সেরে ছোটকাকু গেলেন চোরের কাছে। লোকটিকে জিজ্ঞেস করলেন চুরি করো কেন?

স্যার লোভে পড়ে এই কাজ করেছি। আসলে রাতে একটু মিথ্যে বলেছি।

কি মিথ্যে বলেছ?

মাথানিচু করে থাকলো লোকটি। কথা বলে না। ছোটকাকু তার পকেটে হাত দিয়ে একটি আইডি কার্ড পেলেন। নাম মো. হামিদ। কনস্টেবল কোতয়ালি থানা।

আচ্ছা তুমি পুলিশ সদস্য?

জ্বি স্যার।

পুলিশ সদস্য হয়ে এই কাজ কিভাবে করলে?

এই কাজ করেছি লোভে পড়ে স্যার। ওরা বলেছে এইসবে অনেক টাকা পাওয়া যায়।

আচ্ছা তোমার সাথে আর কারা আছে বলো তো।

না কেউ নেই।

আচ্ছা তুমি কি তোমার চাকরি হারাতে চাও?

না, স্যার আপনি অভিযোগ দিলে আমার চাকরি থাকবে না।

তাহলে সত্যিটা বলো। নাহলে তোমার চাকরি তো যাবেই সাথে জেল জরিমানাও হবে।

না স্যার আপনি এই কাজ করবেন না প্লিজ স্যার। আমি পেশাদার চোর নই। চুরি করার ইচ্ছেও ছিল না। কিন্তু তারা আমাকে বাধ্য করেছে চুরি করতে। আমি লোভে পড়ে এই কাজ করেছি।

নাম বলো।

আমি পারবো না স্যার। আমাকে মেরে ফেলবে।

কারা তোমাকে মারবে?

যারা এই সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত তারা স্যার। আমাকে বলেছে তাদের নাম বললে মেরে ফেলবে।

কিছু হবে না তোমার। তোমাকে আমরা সেই নিরাপত্তা দেবো।

স্যার ওদের হাত থেকে কেউ আমাকে বাঁচাতে পারবে না। আমাকে বাঁচতে দিন স্যার।

তবে শুধু নামটি বলো। আচ্ছা পুরো নাম বলা লাগবে না। তুমি শুধু ার্ধেক সংকেত দাও।

ছোটকাকু লোকটির কাছে গিয়ে কানে কানে বললেন বলো।

লোকটি তখন আস্তে করে করে বলল ইম...

আচ্ছা ঠিক আছে তোমার কিছু হবে না।

কাঁদতে কাঁদতে লোকটি বলল, স্যার আমি কোনোদিন চুরি করতে চাইনি। এরা বারবার আমাকে ঝামেলায় ফেলে বাধ্য করেছে। মেরে ফেলার হুমকি দেয়। তারা এগুলো প্রচুর দামে বিক্রি করে। পার্বত্য অঞ্চলে এদের শক্তিশালী সিন্ডিকেট রয়েছে।

কি করবেন ছোটকাকু। আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে আবার ভাবছেন। তিনি কি ইমকে ফোন দিবেন। ফোন দিলে যদি সে ভেগে যায়। নাকি সরাসরি পুলিশ দিয়ে ধরিয়ে আনবেন। এতক্ষণে ছোটকাকুর আর বুঝতে বাকি নেই কে এর সঙ্গে জড়িত। প্রধান হোতা কে। কিন্তু এটাও কি সম্ভব? মানুষ এত খারাপ কিভাবে হয়? শরিফ সিঙ্গাপুরি গভীর ঘুমে মগ্ন। জোরে জোরে নাক ডাকেন তিনি। অর্শা আর সীমান্তও এখন ঘুমুচ্ছে। ছোটকাকু গেলেন জমিদার বাবুর কাছে। মোহন চৌধুরীর সাথে ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করলেন। পরামর্শ নিলেন কি করা যায়।

মোহন চৌধুরী বললেন একশনে তো যেতেই হবে। আমার এতদিনে বিশ্বাস ভেঙে দিয়ে সে এতবড় অন্যায় করলো তাকে কি ছেড়ে দেবো।

কি ভেবে ছোটকাকু ফোনটি নিলেন। কল করলেন ইমরান মন্ডলকে। ইমরান মন্ডল হচ্ছেন জমিদারের ম্যানেজার। তিনি জমিদারের সবকিছু দেখভাল করেন। তিনি ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান। ফোন বেজে চলেছে কিন্তু ইমরান মন্ডল ফোন ধরলেন না। কয়েকবার ফোন দিলেন ছোটকাকু। না ইমরান মন্ডল ফোন ধরলেন না। কি আর করা ছোটকাকু চেয়ারে বসে মাথানিচু করে একটু ভাবলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই ছোটকাকুর ফেন বেজে উঠলো।

হা ছোটকাকু বলুন। ইমরান মন্ডলের কণ্ঠস্বর।

আমার তো কিছু বলার নেই আপনিই বলুন।

কি হয়েছে ছোটকাকু?

আপনি তো সব জানেন। জমিদার বাড়িতে কি কি ঘটছে এর আদ্যপান্ত আপনার জানা আছে।

আমি তো কিছু জানি না। আমি শুধু জমিদার সাহেবের ডিমেনশিয়ার চিকিৎসার ব্যাপারে জানি।

খুব ভালো ছোটকাকু বললেন। কিন্তু তার ডিমেনশিয়া কি সারবে?

আমরা চেষ্টা করে দেখতে পারি।

ডিমেনশিয়া হলে সারে না। অসুখটা একই রকম থাকে।

ইমরান মন্ডল আর জবাব দিলেন না। আমি একটু পরেই জমিদার বাড়িতে আসবো আপনার সঙ্গে কথা বলবো। কোনো ঘটনা ঘটেছে কি ছোটকাকু?

অনেক কিছুই তো ঘটছে। জমিদার বাড়ির অনেক কিছু চুরি হচ্ছে। এইসব ঘটনা তেকে আপনি বাঁচাতে পারেন জমিদার সাহেবকে।

আমি কিভাবে বাঁচাবো?

বিশ্বাস করুন ছোটকাকু আমি কিছুই জানি না।

ছোটকাকু বললেন আমরা তো বেশকিছু তথ্য পেয়েছি কি কি ঘটছে কেন ঘটছে। আপনি এভাবে অস্বীকার করবেন না প্লিজ।

আমি কিছুই জানি না। একটু পরে আসছি এসে কথা বলবো আপনার সঙ্গে বলেই ফোনের লাইন কেটে দিলেন ইমরান মন্ডল। আবার একটা কথা মনে পড়লে কল করলেন ছোটকাকু। কিন্তু ফোন বন্ধ। সাথে সাথে থানায় ফোন দিলেন ছোটকাকু। ইমরান মন্ডলকে নজরে রাখতে বললেন। তিনি যেন বাড়ি থেকে পালাতে না পারেন। ওসি নিজাম সাহেব দ্রুত ফোর্স পাঠালেন। ছোটকাকু হামিদকে জিজ্ঞেস করলেন তুমি বলো ইমরান মন্ডল ঝামেলায় পড়লে কোথায় গিয়ে পালায়। হামিদ ছোটকাকুকে জানালো এই দ্বিপেই থাকে। তবে মাটির নিচে একটি ঘর আছে সেখানে তিনি লুকিয়ে থাকেন। মাটির নিচের বাড়ির ঠিকানাটা দিলেন হামিদ। ছোটকাকু আর দেরি না করে থানায় ছুটে গেলেন। থানার ওসি আরও সকালে এসেছেন। তিনি অনেক ব্যস্ত। কোথায় কোন ট্রলারে ডাকাতি হলো সেসবের মিটিং। নদী তীরবর্তী এলাকায় পুলিশের অনেক কাজ থাকে।

ছোটকাকু এসেই জানতে চাইলেন ইমরান মন্ডলকে পাওয়া গেল কি না।

ওসি জানালেন তিনি পালিয়েছেন। আমাদের ফোর্স তার বাড়ি পাহারা দিচ্ছে।

ওসিকে ছোটকাকু বললেন, কয়েকজন ফোর্স দিতে।

ওসি বললেন, যান দেখুন কোথাও পাওয়া যায় কি না।

ছোটকাকু পুলিশের ভ্যানে চড়ে বসলেন। তিনি হামিদের দেয়া তথ্যমতে কোতয়ালির শমসের মিয়ার বাড়ি ঘিরে রাখতে বললেন ছোটকাকু। বাড়ির নান্নাঘরের পাশে একটি পাটাতন উল্টাতেই গভীর গর্ত। সেই গর্তের ভেতর কয়েকজন ফোর্স নামালেন ছোটকাকু। সিঁড়ি বেয়ে ফোর্স নামলো। একটু পরে শব্দ পাওয়া গেল। ভেতরে চিৎকার হচ্ছে। আমাকে ছেড়ে দাও। আমাকে কেন তোমরা ধরছ? আমি কোনো অপরাধ করিনি।

এই গূহার ভেতর সবকিছুই আছে বসবাস করার জন্য। ইমরান মন্ডল বড় সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত। তিনি অপরাধ করেই গুহায় লুকিয়ে যান কেউ আর তার খোঁজ পায় না।

যাইহোক ইমরান মন্ডলকে গুহা থেকে বের করা হলো। ছোটকাকু তার বুদ্ধির প্রশংসা করলেন। কোনো কথা বললেন না ইমরান মন্ডল। একটু রাগ রাগ ভাব।

ততক্ষণে সকালের মিষ্টি আলো ঠিকরে পড়েছে। চিকচিক করছে গাছের সবুজ পাতা। একপাশে ইমরান মন্ডল আরেক পাশে ছোটকাকু। একটু দূরে গম্ভীরভাবে বসে আছেন মোহন চৌধুরী।

ছোটকাকু বললেন, ঠিক আছে মানলাম আপনি অন্যকাজে ব্যস্ত। কিন্তু যে লোকটি ধরা পড়েছে সে তো স্বীকার করলো সে চুরি করেছে আপনার কারণে।

কি বলেন বলতেই পারে না ওরা মিথ্যুক। এরা আমাকে ফাঁসাচ্ছে।

আপনাকে ফাঁসাচ্ছে না। আপনি এদেরকে ব্যবহার করে চুরি করান। এরা হচ্ছে আপনার ডানহাত বামহাত। জমিদার বাড়ির সবকিছু চুরি করিয়ে চড়াদামে বিক্রি করাই আপনার কাজ। আপনি পার্বত্য অঞ্চলে গিয়ে এসব বিক্রি করেন সেসব তথ্যও আমাদের কাছে আছে। সুতরাং তথ্য না এড়িয়ে সোজা সবকিছু স্বীকার করে নিন।

আমি এসব কিছুই জানি না। আমাকে শুধু চোর সাব্যস্ত করা হচ্ছে বলেই চিৎকার দিলেন।

তখন ছোটকাকু বললেন আস্তে কথা বলুন চেঁচামেচি করবেন না। আপনি যেসব বই নিয়েছেন আর কামিনি রায়ের ছবিটাও ফেরত দিন।

কি বলেন এসব আমি চোখেই দেখিনি।

কথা না বাড়িয়ে সবকিছু ফেরত দিন বলছি।

আমি কিভাবে ফেরত দিবো? আমি তো এগুলো নেইনি। ছবির জন্ম দেবো আমি?

আবার কথা বাড়াচ্ছেন ইমরান মন্ডল! যা বলেছি সেভাবে কাজ করুন নাহলে আইন যা করবে সেটা কল্পনাও করতে পারবেন না। ছবিটা ফেরত দিন।

ছবিটা কে নিয়েছে আমি জানি না।

এসব মিথ্যা বলে লাভ নেই। আমাদের কাছে তথ্য আছে। আর কে ছবিটা চুরি করে আপনাকে দিয়েছে সেটাও জানি আমরা।

বলুন কে নিয়েছে?

বি আপনাকে ছবিটা চুরি করে দিয়েছে।

কিসব বলছেন?

আমি যা বলছি সত্য বলছি। এ বি সি আপনার লোক। এরা এই বাড়ির প্রতিটি জিনিস নিয়ে আপনাকে দিয়েছে।

সত্যি বলছি আমি ছবি দেখিনি।

আপনি একটি ছবির জন্য আশি হাজার টাকা দিয়েছেন এ বি সিকে। আর বলছেন ছবি দেখেননি।

এবার একটু দম নিলেন ইমরান মন্ডল। মাথা নিচু করে বললেন আসলে ছবিটা দেখেছি কিন্তু আমার কাছে নেই।

এসব কথা না বলে সরাসরি বলুন ছবি কোথায় আছে। দিয়ে দিন। এই জমিদার বাড়ি থেকে আর যেসব জিনিস খোয়া গেছে সব নিয়ে আসুন। নাহলে আপনাকে আইনের হাতে তুলে দেয়া হবে তারাই বের করবে কোথায় আছে। বুঝতেই পারছেন কি হবে। বলেই তিনি ইমরান মন্ডলের জামার কলার ধরে ডাক দিলে এবিসি এদিকে এসো। তোমরা তো পুলিশ সদস্য তাই না। লোকটির জামা খোলো। তারা অনিচ্ছা সত্বেও জামা খুলল। দেখা গেল ইমরান মন্ডলের কোমরে প্যান্টের ভেতর লুকিয়ে রাখা আছে একটি ছোট্ট ছবি। কামিনি রায়ের স্কেচ। ছোটকাকু অবাক হলেন এত সুন্দর দুর্লভ একটি পেইন্টিং এরা নষ্ট করে ফেলছিল! ইমরান মন্ডল চুপ। কথা নেই তার মুখে। কি শাস্তি হওয়া উচিৎ আপনাদের বলুন।

ইমরান মন্ডল হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। আমাকে পুলিশে দিবেন না প্লিজ। এই দ্বিপে আমার অনেক সম্মান আছে সব শেষ হয়ে যাবে।

ইতিমধ্যে থানার ওসি এসে হাজির হয়েছেন। সকালবেলা নদীর হাওয়া খেয়ে তারপর এসেছেন।

কি হলো ছোটকাকু। আপনার আসামীদের পেলেন?

এই যে ইমরান মন্ডল সব দুর্লভ জিনিস চুরি করে বিক্রি করছিলেন। তাকে জমিদার কত বিশ্বাস করতেন। এই বাড়ির সবাই তাকে কত সম্মান করতো সবই ধুলোয় মিশিয়ে দিলেন।

আমরাও ভাবতাম কাছের কেউ এইসব ঘটনা ঘটাচ্ছে। ইমরান তো প্রতিদিনই থানায় যেতেন জমিদারের ডিমেনশিয়া নিয়ে খুব চিন্তিত থাকতেন। কিন্তু ভেতর ভেতরে তিনি যে এই অপকর্ম করছেন আমরা বুঝতেই পারিনি। যাইহোক ফেরত পেলেন কিছু?

কামিনি রায়ের অমূল্য ছবিটি পেয়েছি। আপনারা উনাকে নিয়ে যান বাকি ব্যবস্থা নিন। তাহলে বাকি জিনিসগুলো ফেরত পাওয়া যাবে। একটি দুর্লভ নকশিকাঁথা ছিল সেটা পাওয়া যাচ্ছে না।

জমিদার মোহন চৌধুরী বললেন আমি একজন ব্যর্থ জমিদার। আমার এই সম্পদ আমি রক্ষা করতে পারিনিÑবলে আর্তনাদ করতে লাগলেন। ছোটকাকু জমিদারকে শান্ত করে বললেন এসব কিছু না জমিদার সাহেব। আপনার চারপাশে এত খারাপ মানুষের ভিড়ে আপনি এসব কিভাবে ঠিক রাখবেন বলুন। এসব জিনিস রাষ্ট্রীয়ভাবে রক্ষা করা দরকার।

আপনি সেই ব্যবস্থাই করুন। আমার যা কিছু আছে সব রাষ্ট্রের কাছে থাকলে জিনিসগুলো ভালো থাকবে। এখানে একটি জাদুঘর থাকলে এখানকার প্রজন্ম আমাদের ইতিহাস সম্পর্কে জানবে। বিভিন্ন এন্টিক সম্পর্কে এরা ধারণা পাবে।

ঠিক বলেছেন আমরা সব ব্যবস্থা করবো। ততদিনে ওসি সাহেব এই বাড়ির নিরাপত্তা দিবেন।

ওসি নিজাম বললেন ঠিক আছে ছোটকাকু। এখন থেকে এই বাড়ির দেখাশোনার দায়িত্ব পুলিশের। মোহন চৌধুরী বললেন, আমরা তো ভুলতে ভুলতে ভোলাতে এসে পড়েছিলাম। চলুন বাংলার ভেনিস বরিশাল দেখে তারপর ঢাকাতে যাবেন।

এটা মন্দ বলেননি। বরিশালেই তো আমাদের যাবার কথা ছিল। আমরা এলাম ভোলাতে।

ভ্রমণ কেমন হলো?

এটা তো আনন্দের। এবার রহস্য ভেদ করতে চাইনি কিন্তু সেই রহস্যেই জড়িয়ে গেলাম।

তা ঠিক।

আমরা বরিশালে যাবো কিভাবে?

এখান থেকে স্পিডবোটে যাবো। অনেক মজার ভ্রমণ হবে এই স্পিডবোটে। বেশিক্ষণ লাগবে না। তাড়াতাড়ি পৌঁছে যাবো বরিশালে।

তাহলে চলুন আমরা বেরিয়ে পড়িÑছোটকাকু ছড়া কাটলেন

ভুলতে ভুলতে ভোলাতে

কাঁকড়া আছে ঝোলাতে.... সকলে হোহো করে হেসে উঠলেন।

আরও পড়ুন

লোড হচ্ছে...