Ad space

পড়াই আমার বিনোদন, লেখাও তাই...

প্রকাশ:
45
Image

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম

তাঁর অনেক পরিচয়। শিক্ষক, লেখক, প্রাবন্ধিক, রাজনৈতিক আন্দোলনের কর্মী। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। সবার প্রিয় শিক্ষক। আসুন শুনি তাঁর কথা।

সাহিত্য পড়ব- এতে আমার আগ্রহ ছিল শুরু থেকেই। অল্পস্বল্প লিখতাম। তাই ‘৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগেই এই অনুভূতি হচ্ছিল, সাহিত্য নিয়ে পড়ব। কিন্তু বাবা চেয়েছিলেন, অর্থনীতি পড়ি। পড়াশোনার তখন মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল চাকরি পাওয়া। এখনো তাই। চাকরির জন্য তখন সিএসএস পরীক্ষা দিতে হতো। এ পরীক্ষার জন্য অর্থনীতি পড়লে সুবিধা হবে। কাজেই বাবা মনে করলেন, আমি অর্থনীতি পড়ি। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান আকর্ষণ অর্থনীতি। যারা এ বিষয়ে ভর্তি হবে, তারা অংকে পারদর্শী। পরিসংখ্যান, গণিত তাদের জন্য সমস্যা হবে না। কিন্তু আমি তো পারব না। আব্বাকে বললাম, অর্থনীতি পড়ব না। বাবার সঙ্গে আমার ওই প্রথম দ্বন্দ্ব। তিনি বললেন, তাহলে তুমি কী পড়বে? বললাম, সাহিত্য পড়ব। বলতে পারলাম না, বাংলা সাহিত্য পড়ব। কেননা তাহলে বলতেন, বাংলা তো তুমি ঘরেই পড়ে নিতে পারো। বললেন, ঠিক আছে, তাহলে তুমি ইংরেজি পড়ো। ইংরেজি সম্পর্কে তার ধারণা, এটা সিএসএসের জন্য ভালো। সাবসিডিয়ারি পলিটিকস আর ইকোনমিকস পড়তে বলতেন। ওই একই উদ্দেশ্যে, এগুলো পড়লে সিএসএস পরীক্ষার জন্য উপযুক্ত হতে পারবে। বন্ধুরা যারা একসঙ্গে পাস করে ইউনিভার্সিটিতে চাকরি নিয়েছি পরে, তারা অধিকাংশই কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির জীবনকে একটা প্রস্তুতির সময় মনে করত। তারা প্রস্তুত হতো সিভিল সার্ভিসে যাওয়ার জন্য এবং অধিকাংশই পরীক্ষা দিয়ে ভালো রেজাল্ট করে চলে গেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকলাম রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের বছর। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ছিল। ডাকসুর প্রতিটি হলে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হতো। ছাত্র সংসদগুলো সংস্কৃতি-সাহিত্যচর্চার জন্য, রাজনীতির জন্য খুব বিশিষ্ট ভূমিকা পালন করেছে। ১৯৫৩ সালের জানুয়ারিতে নির্বাচন হলো সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে। আমি ওর মধ্যে ঢুকে গেছি। নিয়ম ছিল, ফার্স্ট ইয়ারে যারা আসবে, তারা হবে সদস্য। ভিপি, জিএস হবেন আরও ওপরের ক্লাসের ছাত্রছাত্রীরা। যুক্তফ্রন্ট হলো মুসলিম লীগবিরোধী। ছাত্রলীগ আছে আর ছাত্র ইউনিয়ন তখন সবেমাত্র গঠিত হয়েছে। ছাত্রলীগ পুরনো প্রতিষ্ঠান। আরেকটি নিয়ম ছিল, ভালো রেজাল্ট না করলে নির্বাচিত হতে পারবে না। আমি ভালো রেজাল্ট করে এসেছিলাম। আইএ পরীক্ষাতে নবম হয়েছিলাম। কাজেই একজন ভালো ছাত্র হিসেবে গণ্য হলাম। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হয়ে সলিমুল্লাহ হলে সদস্য হলাম।

আমার ছাত্রজীবন খুবই মজার কেটেছে। আমরা যে হল ছাত্র সংসদে ঢুকলাম, সেখান থেকে বার্ষিকী বেরোত। সেটি যৌথভাবে সম্পাদনা করেছি। রেডিও অফিস ছিল পাশেই, নাজিমুদ্দিন রোডে। রেডিওতে প্রোগ্রাম করি। পড়াশোনা করি। লাইব্রেরিটি খুব অসাধারণ। লাইব্রেরিতে পড়াশোনা করা শুরু করি। খুব আনন্দের সময় কেটেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি যে চাকরিটি পেলাম, আগে সেখানে ছিলেন কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ। তখন কিন্তু ইংরেজি বিভাগে ফার্স্ট ক্লাস পাওয়া খুব কঠিন ছিল। তিনি প্রথম শ্রেণি পাননি, অনার্সেও নেই, কিন্তু খুবই মেরিটোরিয়াস। লেকচারার হলেন। তিনি থাকবেন। কিন্তু এ ঘটনাটা খুব কৌতূহলপূর্ণ এবং করুণও, তিনি যে মহিলাকে বিয়ে করবেন, তারা শর্ত দিল- টিচারের সঙ্গে পোষাবে না। তারা চায় ধনী লোক, ব্যবসায়ী। তাকে সিএসএস হতে হবে। তিনি সিএসএস পরীক্ষা দিয়ে বোধ হয় সেকেন্ড হলেন। চলে গেলেন। জায়গাটি খালি হলো। ওখানে আমি চাকরি পেলাম। আগে কিন্তু এই ইউনিভার্সিটিতে কেউ অবসর না নিলে বা মারা না গেলে পদ শূন্য হতো না এবং পদ শূন্য না হলে নতুন পদও তৈরি হতো না। এমএ পরীক্ষা দিয়েই চাকরি নিয়েছিলাম হরগঙ্গা কলেজে। আমার আগে মুহিত ভাই- আবুল মাল আবদুল মুহিত, তিনি ইংরেজির প্রভাষক ছিলেন হরগঙ্গায়। তিনি চলে যাওয়াতে ঢুকলাম। আবার হরগঙ্গা কলেজ থেকে জগন্নাথ কলেজে এলাম এমএ পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পরে। সাত মাস ছিলাম। ১৯৫৭ সালের অক্টোবরে জগন্নাথ কলেজ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাডহকে এলাম, যখন আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ খান সিভিল সার্ভিসে চলে গেলেন। পরে রেগুলারাইজ করা হলো।

লেখালেখির জীবন নিয়ে একটু বলি। ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় ফুটবল খেলতে গিয়ে পা ভেঙে গেল। শয্যাশায়ী হয়ে গেলাম। তখন তো উন্নত চিকিৎসা ছিল না। প্লাস্টার করে শুয়ে থাকতে হলো দেড় মাসের মতো। তখনই পত্রিকা পড়ার ঝোঁক তৈরি হলো। আজাদ পত্রিকা ছিল। সেখানে মুকুলের মাহফিল থাকত। মোহাম্মদী পত্রিকা থাকত। আমরা রাজশাহীতে থাকতাম। মুসলিম ইনস্টিটিউট ছিল, বাবা তার সদস্য ছিলেন। কিশোরদের উপযোগী বই এনে দিতেন। এই খেলা থেকে বই পড়া আমার বিনোদনের বিষয় হলো। দ্বিতীয়ত, তখন থেকে ভাবতাম, মুকুলের মাহফিলে আমার বয়সের ছেলেমেয়েরা লিখে, আমিও লিখতে পারব। ওখান থেকে লেখার অভ্যাস করলাম। হাতে লেখা পত্রিকা প্রকাশ করেছি। তারপরে আমরা ঢাকায় আজিমপুর কলোনিতে এলাম ১৯৫০ সালে। কলোনির আমরা প্রথম দিকের বাসিন্দা। এখানে এসে সাহিত্যচর্চার পরিবেশ পেলাম। পাশেই মোহাম্মদী পত্রিকার অফিস, ওখানে লেখা পাঠিয়েছি ছাপার জন্য। তমদ্দুন মজলিসও ছিল আমাদের বাড়ির পাশেই। আমার এক বন্ধু তমদ্দুন মজলিসের সদস্য ছিল। তার মাধ্যমে সাপ্তাহিক সৈনিকের সঙ্গে যুক্ত হয়েছি। ‘দ্যুতি’ নামে একটা মাসিক পত্রিকা ছিল, তার সম্পাদনার দায়িত্ব পেয়েছি। এভাবে লেখার কাজটি চলতে থাকল।

লেখা শুরু করেছিলাম গল্প দিয়ে। কিন্তু গল্পকার বা কথাসাহিত্যিক হওয়া আমার হয়নি দুই কারণে। একটা হচ্ছে, আমি দেখলাম, কথাসাহিত্যিক হওয়ার জন্য যে নিবেদিত চিত্ত লাগে, মানে যে আত্মত্যাগ করতে হয়, সেটি আমার নেই। আমার বন্ধু, যেমন- সৈয়দ শামসুল হক আর আমি একসঙ্গে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছিলাম পাশাপাশি বসে। ও এসেছে কলেজিয়েট স্কুল থেকে। আমি এসেছি সেন্ট গ্রেগরি থেকে। ও সাহিত্যিক হবে। সে জন্য সে সেন্ট গ্রেগরিতে ভর্তি হয়নি। চলে গেছে বোম্বেতে এবং তারপরে এসে ইংলিশে ভর্তি হয়েছিল আমার দুই বছর পর। সেখানেও পড়াশোনা না করে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছে ফুলটাইম লেখক হওয়ার জন্য। ওটি আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি তো সংকীর্ণ মধ্যবিত্ত পরিবেশে সাহিত্যচর্চা করব একটা অতিরিক্ত দিক হিসেবে। ওই যে নিবেদিত চিত্তটা, সেটি প্রবন্ধ লিখতে দরকার হয় না; সেটি কথাসাহিত্যিকদের অভিজ্ঞতা। মধ্যবিত্ত বৃত্তের মধ্যে আমি গল্প লিখেছি। আমার গল্পের বইও আছে। উপন্যাস লেখারও চেষ্টা করেছি। কিন্তু মধ্যবিত্তের বাইরে যাওয়া আমার সম্ভব হয় না। বাইরে না গেলে কথাসাহিত্য হয় না। দ্বিতীয়ত, আমি যেহেতু সাহিত্যের অধ্যাপনা শুরু করলাম, শিক্ষকতা শুরু করলাম, আমার মনে হলো, সাহিত্যের শাখা কথাসাহিত্য এমন উচ্চ পর্যায়ে চলে গেছে যে আমি যতই চেষ্টা করি, ওই পর্যায়ে যেতে পারব না। তার চাইতে সহজ প্রবন্ধ লেখা। প্রবন্ধে আমার বক্তব্য আছে, আমার নিজস্বতা তুলে ধরতে পারি। আমার অভিজ্ঞতা- আমার চিন্তার অভিজ্ঞতা, বই পাঠের অভিজ্ঞতা। কাজেই আমি প্রবন্ধেই চলে এলাম। কিছু অনুবাদও করেছি।

আপনি এত লেখেন, রহস্য কী? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন- রহস্য নেই কোনো। আমার অন্য কোনো কাজ নেই। আমি সৌভাগ্যবান এই দিক থেকে যে স্ত্রী যখন জীবিত ছিলেন, তখন সাংসারিক সব কাজ তিনি করতেন। আমাকে বাজার-টাজারও করতে হতো না। বড়জোর বলত, এই রুটি কিনে আনো। তার মৃত্যুর পরে আমার বড় মেয়ে এই সাংসারিক দায়িত্ব নিল। আমার দুই মেয়ে আছে। আমার তো সাংসারিক কোনো দায়িত্ব নেই। পড়াই আমার বিনোদন। লেখাও আমার বিনোদন। তবে আমি আর আগের মতো পরিশ্রম করতে পারি না। এটি আমার দুঃখ।

আরও পড়ুন

লোড হচ্ছে...