Ad space

মুখোমুখি বাবা আর মেয়ে, বন্ধুত্বই শক্তি!

প্রকাশ:
Image

মুখোমুখি

বাবা আর মেয়ে বন্ধুত্বই শক্তি!

আয় খুকু আয়... এই গানটির মধ্যে বাবা-মেয়ের মধুর সম্পর্কের একটি চিত্র নাট্য খুঁজে পাওয়া যায়। বাবা-মেয়ের সম্পর্কটাই অন্যরকম। মেয়ের ছোটবেলায় বাবাই অভিভাবক। আবার মেয়ের বড় বেলায় মেয়েই বাবার অভিভাবক। বাবা তখন যেন ছোট্ট শিশু। মেয়ের মধুর বকাও খেতে হয় বাবাকে। এই যে বাবা আর মেয়ের সম্পর্কের মধুর রসায়ন সেখানে প্রধান শক্তি আসলে বন্ধুত্ব। যে পরিবারে বাবা-মা ও ছেলে মেয়েদের মধ্যে যত নিবীড় বন্ধুত্ব ও বুঝাপড়া সে পরিবারের বন্ধন ততটাই দৃঢ় হয়। বাবার পাশাপাশি মমতাময়ী মায়ের ভূমিকাও বেশ গুরুত্বপুর্ন। বাবা-মা যখন সন্তানের প্রিয় বন্ধু হয়ে ওঠে তখন যে কোনো পরিবারের স্বপ্ন ও সম্ভাবনা সহজেই বাস্তবে রুপ নেয়। এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ বাবা রামেন্দু মজুমদার ও মেয়ে ত্রপা মজুমদার। তাদের পরিচয় দেবার প্রয়োজন বোধকরি নেই। বাবার মতো এক নামেই ত্রপারও ব্যাপক পরিচিতি। সম্প্রতি আমরা বাবা-মেয়ের মুখোমুখি হয়েছিলাম। রামেন্দু মজুমদার বলেছেন মেয়ের কথা। ত্রপা মজুমদার বলেছেন বাবার কথা। সূত্রধরের ভূমিকায় ছিলেন আনন্দ আলোর সম্পাদক রেজানুর রহমান।

আনন্দ আলো: ত্রপার জন্মের দিনের কথা শুনতে চাই। দিনটা কেমন ছিল?

রামেন্দু মজুমদার: দিনটি ছিল বৃষ্টিমুখর। আমরা তখন সেন্ট্রাল রোডে থাকতাম। সেখান থেকে রিকসায় মিটফোর্ড হাসপাতালে যাই। মিটফোর্ড হাসপাতালে ত্রপার জন্ম। ফেরদৌসীর বড় বোন কাপড়ে জড়ানো একটি ফুটফুটে শিশুকে দুই হাতে বুকে জড়িয়ে নিয়ে আমার সামনে এলেন। মেয়ের মুখ দেখে আমার যে কী আনন্দ হচ্ছিলো তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। মেয়ে হওয়াতে পরিবারের সবাই বেশ খুশি। সেই স্মৃতি এখনও আমাকে আনন্দ দেয়।

আনন্দ আলো: তখনকার দিনে মেয়ে সন্তানের ব্যাপারে অন্যরকম একটা ধারনা ছিল, ছেলে হলে ভালো হতো... এরকম কোনো অনুভূতি কাজ করেছিল?

রামেন্দু মজুমদার: (হাসতে হাসতে) না, এরকম কোনো অনুভূতি কাজ করেনি। তবে আমার মায়ের কথা বলি। তিনি আমাকে বলেছিলেন, ছেলে হলে টেলিগ্রাম করো। মেয়ে হলে চিঠি দিলেই হবে। বলেই আবার হো হো করে হেসে ফেললেন রামেন্দু মজুমদার। পরে হাসি থামিয়ে বললেন, অথচ এই মেয়েই আমার মায়ের অনেক প্রিয় হয়ে উঠেছিল।

আনন্দ আলো: ত্রপার শিক্ষা জীবন, স্কুল, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা শুনতে চাই।

Image

রামেন্দু মজুমদার: ত্রপার স্কুল ছিল আজিমপুর অগ্রণী বালিকা বিদ্যালয়। ফেরদৌসী তখন ওই স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। ফেরদৌসী সকালে মেয়েকে নিয়ে স্কুলে যেতো। আমি ত্রপাকে স্কুল থেকে নিয়ে আসতাম। একটা দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে হতো। রিকসায় করে যাওয়া, অপেক্ষা করা, স্কুল থেকে মেয়েকে নিয়ে আসা। সত্যি বেশ কষ্টের ছিল। আমার মতো আরও অনেক বাবা তাদের মেয়েকে স্কুল থেকে নিতে আসতো। আমি তাদেরকে দেখতাম। বাবা-মেয়ের সম্পর্ক কতই না মধুর। আজিমপুর অগ্রনী বালিকা বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করার পর ত্রপা বদরুন্নেসা কলেজে ভর্তি হয়। বদরুন্নেসার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়... ত্রপা নিজেই যাওয়া আসা করতো।

আনন্দ আলো: প্রিয় সন্তানকে নিয়ে বাবা মায়ের একটা ভবিষ্যৎ ভাবনার জগৎ তৈরি হয়। ত্রপাকে ঘিরে ভাবনার যে জগৎটা তৈরি করেছিলেন তার সঙ্গে এখন কতটা ছিল খুঁজে পান। স্বপ্ন কি সত্যি হয়েছে?

রামেন্দু মজুমদার: স্বপ্নের চেয়ে বেশী পেয়েছি আমরা। আমাদের ইচ্ছে ছিল ত্রপা শিক্ষকতা করবে। অনার্স, এমএ দুটোতেই ভালো রেজাল্ট করলো। অনার্সে ফাস্ট্রক্লাশ ফাস্ট্র হলো। আমাদের ইচ্ছে অনুযায়ী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগে শিক্ষক হিসেবে জয়েন করলো। কিন্তু পেশা হিসেবে বোধকরি শিক্ষকতা ভালো লাগছিলো না। এক বছর পরে ত্রপা ওর মাকে বললো- মা আমি চাকরিটা ছেড়ে দিতে চাই। ততদিনে আমাদের প্রতিষ্ঠান এক্সপেশনে টুকটাক কাজ করতে শুরু করেছে। ত্রপার কথা শুনে সবাই অবাক হলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দেশসেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চাকরি ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে না। অনেকে এক্সপ্রেশন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি দুটোকেই চালিয়ে নেয়ার পরামর্শ দিল। ত্রপার একটাই কথা- এটা নৈতিকতা বিরোধী হবে। এক সঙ্গে দুই জায়গায় কাজ করা ঠিক হবে না। আমি দুটো কাজ এক সঙ্গে পারলেও করবো না। শিক্ষক হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি ছেড়ে দিল ত্রপা। আমাদের বিজ্ঞাপনী সংস্থায় স্থায়ী ভাবে যুক্ত হলো। ত্রপার এই সিদ্ধান্তের ব্যাপারে আমরা কোনো আপত্তি তুলিনি।

আনন্দ আলো: লেখাপড়ার পাশাপাশি টেলিভিশনের নাটকে অভিনয়ের ক্ষেত্রে ব্যাপক আলোচনায় এসেছিলেন ত্রপা। একটা সময় টেলিভিশন নাটক কি ছেড়ে দিলেন ত্রপা?

রামেন্দু মজুমদার: হ্যা। বলতে গেলে একটা সময় টিভি নাটকে অভিনয় ছেড়েই দিল। এর অবশ্য কারণও অছে। ও যেহেতু ফুলটাইম অফিস করতো ফলে টিভি নাটকে অভিনয়ের ক্ষেত্রে সময় দিতে পারতো না। সে কারণে টিভি নাটকে অভিনয় কমিয়ে দিয়েছে। তবে মঞ্চে সক্রিয় আছে। যদিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে চাকরিটা ছেড়ে দেয়ায় ত্রপার মায়ের খুব আক্ষেপ আছে। ওর মায়ের মন্তব্য, ত্রপা যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা পেশাটাকে ধরে রাখতো তাহলে টিভি নাটকে অভিনয়ের জন্য অনেক সময় দিতে পারতো।

আনন্দ আলো: ত্রপা আপনাদের একমাত্র সন্তান। ও মা হয়েছে। এই পরিবর্তনটা কিভাবে দেখেন? মা হিসেবে কেমন দায়িত্ববান?

রামেন্দু মজমুদার: খুবই দায়িত্বপান। ওর এখন অনেক দায়িত্ব। একদিকে বাবা-মাকে দেখাশুনা করা। অন্যদিকে নিজের সন্তানের প্রতি যথাযথ দায়িত্ব পালন করা। একদিকে দুই বড় সন্তান। অন্যদিকে একজন ছোটো সন্তান। মা হিসেবে ওর অনেক দায়িত্ব। ওদের একমাত্র মেয়ে বাইরে পড়াশুনা করে।

আনন্দ আলো: সন্তান হিসেবে ত্রপা কেমন? ওর কিছু গুণের কথা শুনতে চাই?

রামেন্দু মজুমদার: ত্রপার অনেক গুণ। ও সৎ। যে কাজ হাতে নেয়, নিষ্ঠার সঙ্গে করে। কোনো কাজে ফাঁকি দেয় না। ওর বিবেক অত্যন্ত স্পষ্ট, পরিস্কার। স্পষ্ট কথা বলে।

আনন্দ আলো: ত্রপার কোনো দোষ বা ত্রুটি...

রামেন্দু মজুমদার: চট করে রেগে যায়। যদিও এখন ব্যাপারটা অনেক কমেছে।

আনন্দ আলো: সন্তান যখন বাবা-মায়ের বন্ধু হয় তখন সংসারটা সত্যিকার অর্থে আলোকিত হতে থাকে। ত্রপা বন্ধু হিসেবে কেমন?

রামেন্দু মজুমদার: ত্রপা শুধু বন্ধু নয়। আমাদের স্বামী-স্ত্রীর অভিভাবক। কোনো সিদ্ধান্ত নেবার আগে আমি ত্রপার মতামত নেই। ওর মতামত ছাড়া আমি কোনো কাজে হাত দেই না। এক অর্থে ত্রপা আমার বিবেকের কাজ করে। তবে ত্রপার বন্ধুত্বটা ওর মায়ের সঙ্গে বেশী। ওর বিয়ের পর আমরা এক সঙ্গে অর্থাৎ একই পরিবারে থাকি না। কিন্তু দিনে অসংখ্যবার মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলে। তখন কে মা কে সন্তান বুঝা মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়।

Image

আনন্দ আলো: ত্রপা মানুষ হিসেবে কেমন?

রামেন্দু মজমুদার: মানুষ হিসেবে খুবই মানবিক।

আনন্দ আলো: মেয়েকে ঘিরে কিছু স্মৃতির কথা শুনতে চাই।

রামেন্দু মজুমদার: (একটু ভেবে নিয়ে) একটা স্মৃতি কথা বলি। যেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ওদের কনভোকেশন হল। অনার্সে ফার্স্ট্র ক্লাস ফার্স্ট্র হওয়ার জন্য একটা গোল্ড মেডেল পেয়েছিল। ওই কনভোকেশনে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমত্য সেন প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। সেদিন বিরোধীদলের হরতাল ছিল। আমরা হরতাল শুরুর আগে কনভোকেশন স্থলে উপস্থিত হই। আমি তখনকার দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিেেনটর সদস্য ছিলাম। এটা মেয়েকে ঘিরে আমার বেশ আনন্দের স্মৃতি।

১৯৭০ সালে আমার বাবা-মা কলকাতায় চলে যান। ত্রপার জন্মের পর ওকে নিয়ে প্রতি বছরই কলকাতায় যেতাম। কলকাতায় পানিকে জল বলা হয়। এরকম আরও কিছু শব্দ আছে যার সঙ্গে আমাদের শব্দের মিল নেই। একবার কলকাতা থেকে ঢাকায় ফিরছি। তখন এয়ারপোর্টে ওর মা পানিকে জল বলছিলো। ত্রপা ব্যাপারটা খেয়াল করেছে। সে তার মাকে বললো- মা এখন আর জল বলতে হবে না। পানি বল।

আনন্দ আলো: মানুষের জন্য ওর ভালোবাসাটা কেমন?

রামেন্দু মজমুদার: মানুষকে বেশ ভালোবাসে। ভালো কাজ দেখলে ও খুব আনন্দিত হয়। তবে হ্যা, কোনো কাজে ত্রুটি দেখলে কাউকেই ছেড়ে কথা বলে না। বাবা-মা, স্বামীকেও না।

আনন্দ আলো: ত্রপা একজন দক্ষ নাট্য নির্দেশক। এব্যাপারে কিছু বলুন।

রামেন্দু মজুমদার: ত্রপা নাট্য নির্দেশক হিসেবে খুবই কড়া। কোনো ত্রুটি বিচ্যূতি সহ্য করতে পারে না। সে কারেেণ ও যখন নাটকে নির্দেশনা দেয় আমরা দু’জন অর্থাৎ আমি এবং ফেরদৌসী খুবই ভয়ে ভয়ে থাকি। লাভ লেটারস এর কথা একটু বলি। আমরা স্বামী স্ত্রী এই নাটকে অভিনয় করি। কিন্তু এই নাটকের জন্য পুরো কৃতিত্ব দিতে হবে নির্দেশক ত্রপাকে। যেভাবে সে ডিজাইন করেছে, অসাধারণ।

আনন্দ আলো: মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু বলবেন। কোনো পরামর্শ?

রামেন্দু মজুমদার: ত্রপা আরও বেশি মানুষের কথা ভাবুক। ওতো আমাদের একমাত্র সন্তান। তাই মাঝে মাঝে মনে হয় আমরা পৃথিবী থেকে চলে গেলে ওতো একা হয়ে যাবে। পরক্ষনেই যখন ভাবি ওর চারপাশে অনেক বন্ধু আছে। শুভাকাঙ্খী আছে। স্বামী, সন্তান আছে। ওরা নিশ্চয়ই ওকে দেখে রাখবে। ত্রপা খুবই নরম মনের মানুষ। টেনশন বেশি করে। টেনশন কমাতে হবে। ত্রপার সব ভালো গুণ ওর মায়ের কাছ থেকে পাওয়া। প্রিয়তমা স্ত্রী ফেরদৌসী মজুমদার হলেন মজুমদার পরিবারের লক্ষ্মী। স্ত্রী সম্পর্কে কিছু বলতে অনুরোধ করা হলো রামেন্দু মজুমদারকে। একটু ভেবে নিয়ে বললেন, আমি সাধারনত: আমার প্রিয়জনদের নিয়ে কোথাও কিছু বলি না। তবে হ্যা, ফেরদৌসীর অনেক গুণই ত্রপা পেয়েছে। এই যে কাজের প্রতি নিষ্ঠা, নাটকে সময় দেয়া, চরিত্রের মধ্যে ডুবে থাকা, মহড়ায় দেরী না করা, সমকর্মীকে সম্মান করা, নাটকের ক্ষেত্রে সব গুণই ফেরদৌসীর কাছ থেকে পেয়েছে ত্রপা। আরেকটা কথা বলি, মেট্রিক পর্যন্ত স্কুলের বাইরে ত্রপাকে বাড়িতে পড়িয়েছেন ওর মা। একসময় স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন, পাশাপাশি মঞ্চ, টিভি নাটকে অভিনয় করেছেন। এতো ব্যস্ততার পরও সংসারকে গুছিয়ে রেখেছেন। এজন্য স্যালুট জানাই ফেরদৌসীক।

আরও পড়ুন

লোড হচ্ছে...