
ঈদ উৎসব সেই দিন এই দিন

ঈদ উৎসব
সেই দিন এই দিন
ইমদাদুল হক মিলন
আমাদের ছোটবেলার ঈদ ছিল অন্যরকম। আমাদের দেশে ঈদ উৎসব সবচেয়ে বড় উৎসব। পাকিস্তান আমলের কথা বলছি। আমার তখন ৫/৬ বছর বয়স। আমাদের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। বাবা শহরে চাকরি করতেন। ঈদ উপলক্ষে তিনি কখন গ্রামের বাড়িতে আসবেন, আমরা সে জন্য অপেক্ষা করতাম।
ঈদুল ফিতর হোক অথবা ঈদুল আজহাই হোক, ঈদের চাঁদ দেখা নিয়ে বেশ হই চই হতো। তখনকার দিনে তো আর রেডিও টেলিভিশন বিশেষ করে প্রচার মাধ্যমের এতো বিস্তৃতি ছিল না। তাই ঈদের চাঁদ দেখার বিষয়টা বেশ গুরুত্বপুর্ন ছিল। আকাশ পরিস্কার থাকলে ঈদের চাঁদ সহজেই দেখা যেত। কিন্তু আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলেই দেখা দিতো বিপত্তি। তখন রেডিওর খবরের ওপর ভরসা করতে হতো। অবস্থাপন্ন পরিবার ছাড়া আর কারও বাড়িতে রেডিও ছিল না। তাই রেডিওর খবর পাওয়াও বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার ছিল। সন্ধ্যার আগেই গ্রাম, শহরের মানুষজন পশ্চিম আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। কেউ একজন ঈদের চাঁদ দেখা মাত্রই আনন্দে চিৎকার দিতো। ওই যে, ওই যে ঈদের চাঁদ। কাচির মতো বাঁকা দেখতে। ঈদের চাঁদ দেখতে না পাওয়া পর্যন্ত আকাশের দিকেই চোখ থাকতো অনেকের। ঈদের চাঁদ দেখতে পাওয়া মানেই বিরাট আনন্দের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াতো।
ঈদের দিন সকাল বেলার গোশল নিয়ে শুরু হতো আরেক লড়াই। শীতকালে ঈদ হলে গোশল নিয়ে শুরু হতো বিরাট সমস্যা। তবে শীতে কাঁপতে কাঁপতে গোশল করার আনন্দ ছিল অন্যরকম। ঈদের দিন বড়রা পাঞ্জাবি, শার্ট, লুঙ্গি পড়তেন। ছোটদের জন্য ছিল ইংলিশ প্যান্ট। মূলতঃ ঈদগাহেই ঈদের নামাজ হতো। নামাজ শেষে এবাড়ি ও বাড়ি বেড়াতে যাওয়া। দুপুরের মধ্যেই ঈদের আনন্দ শেষ হয়ে যেতো। তবে কোরবানীর ঈদের আনন্দ থাকতো সারাদিন জুড়ে। বর্তমান সময়ের মতো অভিজ্ঞ কসাই পাওয়া যেতো না। কোরবানীর গরু নিজেরাই জবাই করে, মাংস কাটাকাটি করতে হতো নিজেদেরকেই। অনভিজ্ঞ হাতে কাজ গুলো করতে হতো। ফলে কোরবানীর মাংস পেতে কখনও কখনও সন্ধ্যা পেরিয়ে যেত। তারপর রান্না এবং খাওয়া দাওয়া।
আজকের দিনের মতো রেডিও টেলিভিশনের এতো উপস্থিতি তখনকার দিনে ছিল না। ফলে ঈদের দিনের আনন্দ ঈদের দিনই শেষ হয়ে যেতো। দেশ স্বাধীনের পর ঈদের আনন্দ একটা নতুন গতি পেল। ঢাকায় জনসংখ্যা বাড়তে থাকলো। নতুন করে বাসা-বাড়ি তৈরি হতে থাকলো। শপিং মল তৈরি হতে থাকলো। ঈদের কেনাকাটা ঈদ উৎসবের ক্ষেত্রে গুরুত্বপুর্ন হয়ে উঠলো। কোরবানীর ঈদে রাজধানী ঢাকা সহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গরুর হাট জনপ্রিয় হয়ে উঠলো। ঈদ উৎসবে দেশের মানুষ দেশে-বিদেশে বেড়াতে যাওয়া শিখলো। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিস্তৃতির পর ঈদ উৎসবের রঙই পাল্টে গেল।
দেশ স্বাধীনের পর প্রচার মাধ্যমের বিস্তৃতি দেখা দিল। বিটিভিতে ঈদের নাটক, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান, গানের অনুষ্ঠান ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল। বেসরকারী টেলিভিশনের উপস্থিতি বাড়তে থাকায় ঈদের আনন্দ অনুষ্ঠান একদিনের জায়গায় ৭দিনে গিয়ে ঠেকলো। শুধুমাত্র নাটকের কথাই যদি বলি, বিটিভিতে ঈদের একটি বিশেষ নাটক প্রচার হতো। আর এখন দেশের টেলিভিশন চ্যানেল গুলোতে সব মিলিয়ে এক ঈদেই ৩শতাধিক টিভি নাটক ও টেলিফিল্ম প্রচার হয়। এর থেকেই বুঝা যায় ঈদ উৎসবের রঙ কতটা পাল্টে গেছে।
ঈদ উৎসব এখন বানিজ্যেরও অংশ হয়ে উঠেছে। ঈদ উপলক্ষে টিভি অনুষ্ঠানের পাশাপাশি দৈনিক, সাপ্তাহিক পাক্ষিক পত্রিকা সমূহ ঈদ সংখ্যা প্রকাশের যে আয়োজন করে তা বিশেষ ভাবে উল্লেখ করার মতো।
আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...








