Ad space

একটি আড্ডা, হুমায়ূন ফরীদি ও অন্যান্য প্রসঙ্গ

প্রকাশ:
13
Image

প্রয়াত নাট্যজন হুমায়ূন ফরীদিকে নিয়ে কথা বলছিলেন তাঁর বন্ধুরা- ফরিদুর রেজা সাগর, ইমদাদুল হক মিলন ও আফজাল হোসেন। তাঁদের কথা শুনছিলেন মাহফুজ আহমেদ, আমীরুল ইসলাম, আফসানা মিমি, অনিমা রায়, আরিফ খান সহ আরও অনেকে। এতো এতো গুণীজন এক সঙ্গে আড্ডায় বসলে যা হয়... একথা, সেকথা, কথার পিঠে কথা, কথা থামিয়ে কথা চলতেই থাকে। চ্যানেল আইতে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগরের অফিস কক্ষে আড্ডা চলছে অনেকক্ষণ ধরে। বেশ কিছু অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা হল এই আলোকিত আড্ডায়। তার মধ্যে ফরিদুর রেজা সাগর ও আফজাল হোসেন বন্ধু জুটির বহুল আলোচিত গোয়েন্দা সিরিজ ছোটকাকুকে ঘিরে দুইদিন ব্যপি উৎসবের পরিকল্পনা সাজানো হল। ধাানমন্ডির বেঙ্গল গ্যালারিতে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হবে ছোটকাকুকে ঘিরে এই উৎসব। আড্ডার এক পর্যায়ে আলোচনায় উঠে এলেন নন্দিত অভিনেতা হুমায়ূন ফরীদি। বলা বাহুল্য, আফজাল হোসেন, ফরিদুর রেজা সাগর, ইমদাদুল হক মিলন, শাইখ সিরাজ, আব্দুর রহমান, সুবর্না মুস্তাফা, পাভেল রহমান, সানাউল আরেফিন, আলমগীর হোসেন সহ আরও অনেকে বন্ধুত্বের উদারতায় নিজেদের একটা আপন জগৎ তৈরি করেছেন। যে জগতে বিশ্বাস, শ্রদ্ধা, মায়া, মমতা এবং প্রত্যেকে আমরা পরের তরে... এই মানসিক শক্তিটাই গুরুত্বপুর্ন। আর তাই কখনও একজন ডাক দিলেই অন্যরা হাজির হয়। ব্যস্ত জীবনেও বন্ধুর ডাক বলে কথা। 

তো, ফরিদুর রেজা সাগরের রুমে আড্ডার এক পর্যায়ে উঠে এলো হুমায়ূন ফরীদির প্রসঙ্গ। ফরীদির টিভি অভিনয়ের খ্যাতি, চলচ্চিত্রে পদার্পন, কত স্মৃতি, কত কথা। ফরিদীর তারকাখ্যাতির প্রসঙ্গ উঠলো। আফজাল হোসেন স্মৃতির ঝাপি খুলে ধরলেন- 

ফরীদি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তো। আমরা মাঝে মাঝে ওর সঙ্গে দেখা করতে যেতাম। জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববদ্যিালয়ের রাস্তা গুলো বেশ সুন্দর। আমরা রাস্তা  দিয়ে হাঁটছি। বিপরীত দিক থেকে ২/৩ জন মেয়ে আসছে। তারা আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে গেল। ফরীদিকে উদ্দেশ্য করে একজন বললো, ভাইয়া গতকাল টিভিতে আপনার নাটক দেখলাম। খুউব, খুউব, ভালো লেগেছে। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। 

ফরীদি মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলো- আমার অভিনয় সত্যি ভালো লেগেছে?  

মেয়েরা সবাই ঝরনার মতো কলকলিয়ে উঠলো- হ্যা ভাইয়া, আপনার অভিনয় অনেক অনেক ভালো লেগেছে। দারুণ, দারুণ, দারুণ...

ফরিদীর হঠাৎ মেয়েদের উদ্দেশে বললোন- আমার নাটক তো ভালো লেগেছে, তোমরা আমাকে বিয়ে করবা... 

আফজাল হোসেনের কথা শুনে আড্ডার সবাই আনন্দে হো হো করে হেসে উঠলেন। আনন্দের এই হাসি যেন থামছেই না।  হাসির ফোয়ারায় এবার ধুপ জ্বেলে দিলেন ইমদাদুল হক মিলন। বললেন, ফরীদি অনেক কঠিন কথা সহজ করে বলতো। একদিন ফরীদি বললো, দোস্ত বিদেশে গেলে হোটেলে বেশ আরাম করে থাকা যায়। আমি ব্যাপারটা বুঝতে না পেরে জানতে চাইলাম- সেটা কি রকম? 

ফরীদি বললো, বিদেশের হোটেলের রুমে ইচ্ছে করলেই ন্যাংটা থাকা যায়। আহ! কী শান্তি... 

Image

ইমদাদুল হক মিলনের কথা শুনে আড্ডায় উপস্থিত সবাই আবার মহা আনন্দে হো হো করে হাসতে থাকলেন। 

আফজাল হোসেন আবারও প্রসঙ্গ টেনে নিলেন। বললেন, একদিন আমরা মতিঝিলে সাগরদের খাবার দাবার এ আড্ডা দিচ্ছি। ফরীদি হোটেলের বাইরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ একজন লোক এগিয়ে এসে গদ গদ ভঙ্গিতে বললো, ভাই গতরাতে বিটিভিতে আপনার নাটক দেখেছি। আপনার অভিনয় খুউব ভালো লেগেছে। আপনার হাতটা একটু ছুঁয়ে দেখতে পারি? ফরীদির ডান হাতে সিগারেট। তাই বাম হাত বাড়িয়ে দিলেন। লোকটি ফরীদির হাত ধরার পর আর ছাড়ছে না। ফরীদি হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করছেন। তাতে কাজ হচ্ছে না। বরং লোকটি আরও জোরে ফরিদীর হাত ধরে রাখার চেষ্টা করছে। 

ফরীদি তখন উদ্ভট একটা কান্ড ঘটালো। লোকটিকে বললো- ভাই হাতটা ছাড়েন। একটু আগে ছোট ঘরে গিয়া বড় কাজ সাইর‌্যা আসছি তো...

হাসির রোল যেন থামেই না। ইমদাদুল হক মিলন বললেন, আমাদের বন্ধুদের মধ্যে ফরীদি অতুলীয়। ওর তুলনা হয় না। 

আফজাল হোসেন এবার নতুন তথ্য দিলেন। ফরীদি খাবার দাবারে এসেছে। ওকে পিঠার সঙ্গে সালাদ দেওয়া হল। কাউকে কোনো প্রশ্ন করলো না। সালাদ দিয়েই দিব্বি পিঠা খেয়ে ফেলল। এবার ইমদাদুল হক মিলন বললেন, বন্ধুদের অনেকের চেয়ে ফরীদিকে আমি চিনি বহু আগে থেকে। ও তখন নারায়নগঞ্জে থাকতো। আমি ’৭২ সাল থেকে ফরীদিকে চিনি। আফজালদের সঙ্গে বোধকরি ’৭৪ সালে পরিচয়। আমি মাঝে মাঝে নারায়নগঞ্জে যেতাম। কামরান বলে একজন আর্টিস্ট ছিলেন। মাহবুব কামরান এখন বেঁচে নেই। ওদের সঙ্গে ফরীদির বন্ধুত্ব ছিল। নারায়নগঞ্জের আলম কোবিনের সামনে ফুটপাতে বসে ফরীদিরা আড্ডা দিত। ফরীদির পায়ে থাকতো দুই পায়ে দুই ধরনের সেন্ডেল। তখন থেকেই ফরীদি ছিল অন্যরকম...

Image

ফরীদির লম্বা চুলের কথা উঠলো। মিলন বললেন, লম্বা চুল অনেক পরের প্রসঙ্গ। ফরীদি লুঙ্গি পড়ে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিত। 

আড্ডায় সৈয়দ রহমান তারেক নামে এক কবির কথা উঠলো। সবাই তাকে চেনার চেষ্টা করলেন। মিলন বললেন, তারেক খুব ভালো গল্প লিখতো। পাশ থেকে ফরিদুর রেজা সাগর বললেন প্রজাপতি, প্রজাপতি...

মিলন বললেন প্রজাপতি নামে একটি পত্রিকা বের করতে চেয়েছিল না? 

আফজাল হোসেন বললেন, হ্যা। 

বেরিয়েছিল কি দুই একটা সংখ্যা? প্রশ্ন করলেন ইমদাদুল হক মিলন। 

ফরিদুর রেজা সাগর বললেন, পত্রিকার নাম দিয়ে দুই একটা বিজ্ঞাপন ছেপেছিল। 

মিলন বললেন, হ্যা আমি ওর অফিসে গিয়েছিলাম কয়েকবার। 

হঠাৎ শহীদুল হক খানের প্রসঙ্গ উঠলো। আফজাল হোসেন বললেন, শহীদুল হক খান একটা পত্রিকা বের করেছিলেন, নাম শ্রীমতি। 

মিলন বললেন, পত্রিকাটা দেখতে ভালো ছিল। আফজাল হোসেন বললেন- প্লে বয়ের বাংলা সংস্করণ। 

আফসানা মিমি অবাক হয়ে জানতে চাইলেন- তাই? 

মিলন বললেন, হ্যা তাই। 

আফজাল হোসেন বললেন, ওই অর্থে ঠিক নয়... তবে দুর্দান্ত সাহসের কাজ ছিল। ফরিদুর রেজা সাগর বললেন- শহীদুল হক খান এরকম আরও অনেক পত্রিকা বের করে ছিলেন। ‘হৃদয়ে বাংলাদেশ’ নামেও তার একটা পত্রিকা ছিল। ঢাকা কলেজের উল্টো দিকে পত্রিকার অফিস ছিল। 

এবার প্যাকেজ নাটকের প্রসঙ্গ উঠলো। আফসানা মিমি বললেন, আমরা প্রথম প্যাকেজ নাটক করি শহীদুল হক খানের...

ফরিদুর রেজা সাগর নামটা মনে করিয়ে দিলেন- প্রাচীর পেরিয়ে। 

আফসানা মিমি বললেন- আমি, শমী, জাহিদ আর হাকিম। নাটের গুরু... 

মিলন বললেন- এটা প্যাকেজের সেকেন্ড নাটক। প্রথম নাটক আমার লেখা- কোথায় সে জন।

কথায় কথায় সমরেশ বসুর প্রসঙ্গ উঠলো। সমরেশ বসুকে খুব শ্রদ্ধা করতেন শহীদুল হক খান। তাকে নিয়ে বাংলাদেশে অনেক অনুষ্ঠান করেছেন। ছুটির ফাঁদে। সিনেমার প্রসঙ্গ উঠলো। শহীদুল হক খানের এই সিনেমায় কলকাতার নায়িকা ঝুমুর গাঙ্গুলী ছিলেন। নায়ক ছিলেন উজ্জ্বল। আরও ছিলেন বিখ্যাত অভিনেতা গালাম মুস্তাফা। এই সিনেমায় সুন্দর একটা গান আছে শাহনাজ রহমত উল্লাহর। সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে নিয়ে ‘কলমীলতা’ নামে একটা ফিল্ম করেছিলেন শহীদুল হক খান। বললেন আমীরুল ইসলাম। ফরিদুর রেজা সাগর বললেন, এই সিনেমাটি আমাদের কাছে আছে। তিনি আরও জানালেন, বাংলাদেশের ৯শ সিনেমা রয়েছে ইমপ্রেস টেলিফিল্ম এর ভান্ডারে। ২০ হাজার গান রয়েছে আমাদের কাছে। 

Image

সব শুনে আফজাল হোসেন বললেন, সিনেমা নিয়েই তো আরেকটা টিভি চ্যানেল হতে পারে। অবুঝ মন... এই ছবি গুলোও তোমাদের কাছে আছে? ফরিদুর রেজা সাগরকে প্রশ্ন করলেন আফজাল হোসেন। ফরিদুর রেজা সাগর বললেন, শুধু অবুঝ মন নয় কাজী জহিরের অনেক সিনেমা আছে আমাদের কাছে। 

আড্ডা চলতেই থাকে। চলতি সিনেমা প্রসঙ্গও ওঠে। মাইকেল, রইদ, দিলুপি সিনেমার প্রসঙ্গও বাদ যায় না। দল বেধে মাইকেল দেখার সিদ্ধান্তও নেন সবাই। 

গঠনমূলক আড্ডা মানুষের সৃজনশীল ভাবনা ও স্বপ্নকে বিকশিত করে। আজকাল বন্ধুদের মাঝেও সেই অর্থে গঠনমূলক আড্ডা হয় না। এমন বাস্তবতায় আলোচ্য আড্ডাটি সবার জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারে। বন্ধুদের সঙ্গে, সহকর্মীদের সঙ্গে, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে, বাবা-মা, ভাইবোনের সঙ্গে, সর্বোপরি সন্তানদের সঙ্গে মন খুলে আড্ডা দিন। প্রাণ খুলে হাসুন। শরীর, স্বাস্থ্য ও মন তরতাজা হয়ে উঠবে। হ্যা, এটাই সত্যি।  



আরও পড়ুন

লোড হচ্ছে...