Ad space

সবার সেরা স্পেন

প্রকাশ:
22
Image

শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদার লড়াইয়ে তিন বারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে পরাস্ত করে ২০২৬ এর বিশ্বকাপ ফাইনালে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে স্পেন। ১৬ বছর পর এটি স্পেনের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়। ঐতিহাসিক মেটলাইফ স্টেডিয়ামে শ্বাসরুদ্ধকর ফাইনালে মেসির আর্জেন্টিনা ইয়ামালের স্পেনের বিপরীতে সেভাবে দাঁড়াতেই পারেনি। ফাইনালে ফুটবলের যাদুকর আর্জেন্টিনার মেসি ছিলেন অনেকটাই নিস্প্রভ।  স্পেনের পক্ষে একমাত্র গোলটি করেন ফেরান তেরেস। স্পেনের তারুন্য নির্ভর ফুটবল দলটির কাছে অভিজ্ঞতায় পরিপুষ্ট আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপের ফাইনালে বলতে গেলে অসহায় আত্মসমর্পণ করেছে।

ফুটবলকে কেন “দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ” বলা হয়, তার উত্তর যেন আরেকবার লিখে দিল ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের ফাইনাল। বিশ্ব ফুটবলের র‌্যাংঙ্কিংয়ের এক ও দুই নম্বর দলের লড়াই যখন একই মঞ্চে, তখন তা নিছক একটি ফুটবল ম্যাচ হয়ে থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে আবেগের, কৌশলের, সাহসের এবং অপেক্ষার এক অনন্য মহাকাব্য। নিউ জার্সির গ্যালারি তখন দুই রঙে বিভক্ত। একদিকে লাল-সোনালি স্পেনের স্বপ্ন, অন্যদিকে নীল-সাদা আর্জেন্টিনার ভালোবাসা। পৃথিবীর কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর চোখ তখন একটিমাত্র ট্রফির দিকে। কোন দেশ হবে বিশ্বের সেরা? কে লিখবে নতুন ইতিহাস? শুরু থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় স্পেন। বল দখল, আক্রমণ আর নিখুঁত পাসিং ফুটবলে একের পর এক আক্রমণে তারা ব্যতিব্যস্ত করে তোলে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগকে। আর সেই চাপ সামলাতে গিয়ে যেন নিজের ক্যারিয়ারের অন্যতম কঠিন রাতটি কাটাতে হয় আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে। যে মার্টিনেজকে সবাই  বড় মঞ্চের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর গোলরক্ষকদের একজন হিসেবে জানি, তিনিও হয়তো উপলব্ধি করেছেন বিশ্বকাপের ফাইনালে গোল পোস্ট আগলে রাখা কতটা ভয়াবহ একটি দায়িত্ব। 

Image

ম্যাচের সময় যতই গড়িয়েছে, স্পেনের আক্রমণের ধার ততই বেড়েছে। কিন্তু মার্টিনেজ যেন হয়ে উঠেছিলেন এক অদম্য প্রাচীর। কখনও ঝাঁপিয়ে পড়ে, কখনও দুই হাতে, কখনও বুক দিয়ে তিনি ফিরিয়ে দিয়েছেন স্পেনের নিশ্চিত গোলের সুযোগগুলো। অন্যদিকে, ফুটবল বিশ্বের কোটি ভক্তের অপেক্ষার নাম লিওনেল মেসি। বিশ্বকাপের আরেকটি ফাইনালে হয়তো সবাই অপেক্ষা করছিলেন তার জাদুকরি পায়ের স্পর্শের জন্য। কিন্তু এদিন মেসিকে যেন আটকে রেখেছিল স্পেনের দুর্দান্ত পরিকল্পনা। নিস্প্রভ ছিলেন ফুটবলের এই জাদুকর। তাকে ঘিরে রাখা হয়েছিল এতটাই নিখুঁতভাবে যে, ম্যাচজুড়ে নিজের ছন্দ খুঁজে পাননি তিনি। তবে ফাইনাল বলে কথা। নাটকীয়তা ছাড়া বিশ্বকাপের শেষ অধ্যায় কি সম্পূর্ণ হয়? ৯০ মিনিটে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন আর্জেন্টিনার এনজো ফার্নান্দেজ। অনিয়ন্ত্রিত এক ফাউলের কারণে সরাসরি লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। দশজনের দলে পরিণত হয় আর্জেন্টিনা। সেই মুহূর্তে স্পেনের সমর্থকদের গ্যালারিতে শুরু হয় নতুন করে স্বপ্ন দেখা। 

এরপর একের পর এক আক্রমণে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগে ঝড় তোলে স্পেন। লামিন ইয়ামালের নেওয়া ফ্রি-কিকে স্টেডিয়ামের হাজারো কণ্ঠে গোলের উল্লাস যেন প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বাজপাখির মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে আবারও আর্জেন্টিনাকে বাঁচান মার্টিনেজ। নির্ধারিত ৯০ মিনিট গোলশূন্য ড্রয়ে শেষ হওয়ার পর ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। আর তখনই শুরু হয় বিশ্বকাপ ফাইনালের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অধ্যায়। ৯৫ মিনিটে স্পেন বল জালে জড়িয়েও উল্লাস করতে পারেনি। মিকেল মেরিনোর হাতে বল লাগার কারণে ভিএআরের সিদ্ধান্তে বাতিল হয়ে যায় গোলটি। হতাশ স্পেন, স্বস্তির নিঃশ্বাস আর্জেন্টিনার। কিন্তু স্পেন থামেনি। যেন গোলের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল লা রোজা। বলের দখল আর আক্রমণের ধার অব্যাহত রাখে তারা। আর্জেন্টিনা তখন অনেকটাই এলোমেলো। ম্যান টু ম্যান মার্কিং ভাঙতে গিয়ে তাদের রক্ষণে দেখা দেয় বড় ধরনের ফাঁক। অবশেষে ১০৫ মিনিটে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ৭ নম্বর জার্সিধারী ফেরান তোরেস নিখুঁত এক আক্রমণে বল ঢুকিয়ে দেন আর্জেন্টিনার জালে। মুহূর্তেই লাল-সোনালি সমুদ্রে পরিণত হয় স্টেডিয়াম। মনে হচ্ছিল, গোটা বিশ্ব যেন একসঙ্গে দাঁড়িয়ে দেখছে ইতিহাস রচনার সেই ক্ষণ। এ গোলটি শুধু একটি গোল ছিল না। এটি ছিল স্পেনের চার বছরের পরিকল্পনা, একটি নতুন প্রজন্মের উত্থান এবং আধুনিক ফুটবলের নান্দনিকতার প্রতিফলন। গোল হজম করার পর মরিয়া হয়ে ওঠে আর্জেন্টিনা। শেষ শক্তিটুকু দিয়ে ম্যাচে ফেরার চেষ্টা চালায় তারা। কিন্তু এদিন যেন কিছুই হচ্ছিল না লিওনেল মেসির। কখনও ভুল পাস, কখনও বল নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা ম্যাচজুড়ে নিজের নামের প্রতি সুবিচার করতে পারেননি তিনি। ১১২ মিনিটে ফেরান তোরেস আরও একটি গোলের দেখা পেলেও অফসাইডের কারণে বাতিল হয়ে যায় সেটি। আর্জেন্টিনার জন্য সেটি ছিল একপ্রকার জীবন ফিরে পাওয়ার মুহূর্ত। শেষদিকে মেসির একটি শক্তিশালী শটে আঘাত পান মেরিনো। আর্জেন্টিনা সমর্থকদের হৃদয়ে তখন শেষ আশার প্রদীপটি জ্বলছিল টিক টিক করে। আর স্পেনের সমর্থকরা গুনছিলেন শেষ বাঁশির অপেক্ষার প্রতিটি সেকেন্ড। ১২০ মিনিট শেষে আর্জেন্টিনা আরও কয়েকটি আক্রমণ করলেও স্পেনের রক্ষণভাগ এবং গোলরক্ষক উনাই সিমন ছিলেন অবিচল। পুরো ম্যাচে তাকে খুব বেশি পরীক্ষা দিতে না হলেও প্রয়োজনের মুহূর্তে ছিলেন নির্ভরতার প্রতীক। অবশেষে রেফারির শেষ বাঁশি। নিউ জার্সির আকাশে উড়তে শুরু করে স্পেনের লাল-সোনালি পতাকা। দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের শিরোপা নিজেদের ঘরে তোলে স্পেন। অন্যদিকে, আর্জেন্টিনা হারলেও হারায়নি তাদের লড়াইয়ের গল্প। এই দলটি বিশ্বকাপের মঞ্চে আবারও প্রমাণ করেছে, ফুটবল কেবল জয়-পরাজয়ের হিসাব নয়; এটি ভালোবাসারও আরেক নাম। লিওনেল মেসির জন্য এটি হয়তো স্বপ্নভঙ্গের রাত। কিন্তু ফুটবল তাকে মনে রাখবে তার জাদুকরী পথচলার জন্য। আর স্পেন মনে রাখবে এই রাতটিকে নতুন স্বর্ণযুগের সূচনা হিসেবে। ফুটবলের সৌন্দর্য এখানেই এক দলের চোখে আনন্দাশ্রু, অন্য দলের চোখে বেদনার জল। অথচ দু’দলের গল্পই থেকে যায় ইতিহাসের পাতায়। ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল তাই শুধু একটি ম্যাচ নয়। এটি ছিল অপেক্ষার, আবেগের, ভালোবাসার এবং মহাকাব্যিক ফুটবলের এক অবিস্মরণীয় রাত্রি। “কারণ, বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যায়, কিন্তু কিছু ফাইনাল চিরকাল বেঁচে থাকে।”

Image

রদ্রি পেলেন গোল্ডেন বল

একদিকে তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, অন্যদিকে নতুন ফুটবল দর্শনের প্রতীক স্পেন। ১২০ মিনিটের শ্বাসরুদ্ধকর লড়াই শেষে অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের এক গোলেই স্পেন জিতে নেয় তাদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা। কিন্তু এই বিশ্বকাপ শুধু একটি ট্রফির গল্প নয়, এটি চারজন মহাতারকার চারটি ভিন্ন অধ্যায়ের গল্প। ফুটবলকে দাবার বোর্ডের মতো সাজিয়ে বিশ্বসেরা হলেন রদ্রি অনেকেই মনে করেন, বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় মানেই সবচেয়ে বেশি গোল করা ফুটবলার। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপ সেই ধারণা বদলে দিয়েছে। গোল্ডেন বল জিতেছেন স্পেনের মিডফিল্ড জেনারেল রদ্রি। পুরো টুর্নামেন্টে তিনি ছিলেন স্পেনের মস্তিষ্ক। কখন আক্রমণ হবে, কখন খেলার গতি কমবে, কখন প্রতিপক্ষের আক্রমণ থামাতে হবে সব কিছুর নিয়ন্ত্রণ ছিল তার পায়ের জাদুতে। বল হারিয়েছেন খুব কম, পাসিংয়ের নিখুঁততা ছিল ঈর্ষণীয়, আর মাঠের প্রতিটি ইঞ্চিতে ছিল তার রাজত্ব। অনেকে বিশ্বকাপে মেসি, জিদান, মদ্রিচ কিংবা ইনিয়েস্তার মতো কিংবদন্তিদের গোল্ডেন বল জয়ের গল্প জানেন। এবার সেই তালিকায় নিজের নাম লিখিয়ে নিলেন রদ্রি। একজন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হয়েও বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় হওয়া প্রমাণ করে ফুটবল শুধুই গোলের খেলা নয়, এটি বুদ্ধিমত্তা ও নেতৃত্বের খেলাও। স্পেনের বিশ্বকাপ জয়ের পেছনে যদি একজন নীরব পরিচালককে খুঁজতে হয়, তবে তার নাম হবে রদ্রি। 

এমবাপ্পে পেলেন গোল্ডেন বুট

বিশ্বকাপের গোলের রাজা, কিলিয়ান এমবাপ্পে: ২০১৮ সালে বিশ্বকাপ জয়, ২০২২ সালে ফাইনালে হ্যাটট্রিক, আর ২০২৬ সালে গোল্ডেন বুট। বিশ্বকাপের মঞ্চ যেন কিলিয়ান এমবাপ্পের জন্যই তৈরি। এই টুর্নামেন্টে তিনি ছিলেন ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। গতি, ড্রিবলিং, দুর্দান্ত ফিনিশিং এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে ভেঙে দেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা তাকে আবারও গোলের সিংহাসনে বসিয়েছে। বিশ্বকাপ জিততে না পারলেও এমবাপ্পে জিতেছেন কোটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয়। ব্যক্তিগত অর্জনের খাতায় যুক্ত হয়েছে আরও একটি স্বর্ণালি অধ্যায়। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বকালের অন্যতম সেরা ফরোয়ার্ড  হওয়ার পথে তিনি আরও একধাপ এগিয়ে গেলেন। একজন ফুটবলারের জীবনে সব ট্রফি জেতা সম্ভব নয়, কিন্তু নিজের নামকে কিংবদন্তির পাশে দাঁড় করানো সম্ভব। এমবাপ্পে সেটিই করছেন বছরের পর বছর। 

বিশ্বকাপ জিততে হলে শুধু গোল করলেই হয় না। গোল বাঁচাতেও জানতে হয়। আর সেই কাজটিই করেছেন স্পেনের গোলরক্ষক উনাই সিমন। ফাইনালে আর্জেন্টিনার একের পর এক আক্রমণ সামলে তিনি যেন হয়ে উঠেছিলেন একটি জীবন্ত প্রাচীর। পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে তার অসাধারণ সেভগুলো স্পেনকে বহুবার বিপদের হাত থেকে বাঁচিয়েছে। গোলরক্ষকদের অনেক সময় আলোচনায় আনা হয় না। অথচ বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্টে একটি সেভই কখনও কখনও একটি গোলের চেয়েও বেশি মূল্যবান হয়ে ওঠে। গোল্ডেন গ্লাভস হাতে নেওয়ার মুহূর্তে উনাই সিমনের চোখেমুখে ছিল বিশ্বজয়ের তৃপ্তি। ফুটবল ইতিহাসের পাতায় হয়তো গোলদাতাদের নাম বড় অক্ষরে লেখা থাকে, কিন্তু উনাই সিমন প্রমাণ করলেন বিশ্বকাপের ট্রফি গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে থেকেও জেতা যায়।


Image

ফেরান তোরেস: একটি গোল, একটি মুহূর্ত, একটি অমর গল্প

বিশ্বকাপ ফাইনালে গোল করার সৌভাগ্য খুব কম ফুটবলারের হয়। আর বিশ্বকাপ জেতানো গোল? সেটি তো ফুটবল ইতিহাসে অমরত্ব পাওয়ার টিকিট। অতিরিক্ত সময়ের সেই মুহূর্তে পুরো স্টেডিয়াম যখন শ্বাসরুদ্ধ হয়ে অপেক্ষা করছিল, তখন ফেরান তোরেস লিখে ফেললেন নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় গল্প। তার করা একমাত্র গোলটিই স্পেনকে এনে দেয় বিশ্বকাপের শিরোপা। ফাইনালের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হওয়া ছিল সেই অবিস্মরণীয় মুহূর্তের স্বীকৃতি। আগামী ২০, ৩০ কিংবা ৫০ বছর পরেও যখন ২০২৬ বিশ্বকাপের কথা বলা হবে, তখন বলা হবে ফেরান তোরেসের গোলে স্পেন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল।” একজন ফুটবলারের জন্য এর চেয়ে বড় পরিচয় আর কী হতে পারে? “কেউ খেলার ছন্দ লিখেছেন, কেউ গোলের গল্প, কেউ দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছেন, আর কেউ লিখেছেন বিশ্বজয়ের শেষ কবিতা” ফুটবল আসলে একটি বলের পেছনে ২২ জন মানুষের ছুটে চলার গল্প নয়। ফুটবল হলো আবেগের নাম, স্বপ্নের নাম, ইতিহাস লেখার নাম। ২০২৬ বিশ্বকাপ আমাদের শিখিয়েছে, একজন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন তৈরি হয় অনেকগুলো গল্পের সমন্বয়ে। রদ্রি আমাদের শিখিয়েছেন নেতৃত্ব কী। এমবাপ্পে দেখিয়েছেন প্রতিভার কোনো পরাজয় নেই। উনাই সিমন বুঝিয়েছেন, একজন গোলরক্ষকও ইতিহাসের নায়ক হতে পারেন। আর ফেরান তোরেস লিখেছেন সেই শেষ কবিতা, যার নাম বিশ্বজয়। বিশ্বকাপের ট্রফি আজ স্পেনের হাতে। কিন্তু এই বিশ্বকাপ ফুটবলপ্রেমীদের উপহার দিয়েছে চারটি অমর নাম, চারটি অনবদ্য গল্প এবং অসংখ্য আবেগের মুহূর্ত। একদিন হয়তো ফেরান তোরেস অবসর নেবেন, রদ্রি মাঠ ছাড়বেন, এমবাপ্পের গতি থেমে যাবে, উনাই সিমনের গ্লাভস খুলে রাখা হবে জাদুঘরে। কিন্তু ২০২৬ সালের সেই গ্রীষ্মের গল্প, সেই বিশ্বজয়ের রাত এবং এই চার নায়কের নাম ফুটবল ইতিহাসের পাতায় চিরকাল সোনালি অক্ষরে লেখা থাকবে। কারণ বিশ্বকাপ শেষ হয়, কিন্তু বিশ্বকাপের গল্প কখনো শেষ হয় না।

Image

মেসির অসহায় কান্না

ফুটবল থেকে মেসির বিদায় নিশ্চিত কিনা  তা এখনও স্পস্ট নয়। তবে এবারের বিশ্বকাপের ফাইনালে ফুটবল  জাদুকর মেসি খুব একটা চমক দেখাতে পারলেন না। ফাইনালে স্পেনের কাছে আর্জেন্টিনা হেরেছে। হেরেছেন মেসিও। যদি এটাই মেসির শেষ খেলা হয় তাহলে কি নিয়ে গেলেন মেসি? গোল্ডেন বুটের লড়াই টিকে রেখেছিলেন। কিন্তুু ফ্রান্সের এমবাপ্পের দখলে গেছে গোল্ডেন বুট। ফাইনালে পরাজয়ের পর মেসি প্রচন্ড হতাশার চোখে বার বার আকাশের দিকে তাকাচ্ছিলেন। গ্যালারী  থেকে মেসির প্রতি সমবেদনা জানাতেই মেসি...মেসি চিৎকার  ভেসে আসতেই আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না। মাঠের উপর বসেছিলেন একা। হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন। গ্যালারীর হাজার হাজার মানুষের মুখে মেসি... মেসি... রব শুনে আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না। কেঁদে ফেললেন। তার এই কান্না গোটা বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষকেও আবেগ আপ্লুত করেছে। মেসির জন্য হাউমাউ করে কেঁদেছেন অনেকে। এক সময় স্পেনের তারকা খেলোয়াড়  ইয়ামাল এগিয়ে এসে মেসিকে সান্ত¦না দেন। দু’জন দু’জনকে জড়িয়ে ধরেন। এই দৃশ্যও পৃথিবীর অনেক ফুটবল প্রেমী মানুষকে কাঁদিয়েছে।

মেসির জীবনে কান্না নতুন কী! ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে হেরে কেঁদেছেন। দুই বছর পর কোপা আমেরিকার ফাইনালে হারের পরও দৃশ্যটা পাল্টায়নি। সেবার তো অবসরই নিয়ে ফেলেন। সিদ্ধান্ত পাল্টে ফেরার পর ধীরে ধীরে পাল্টেছে তাঁর কান্নার ভাষা—যেমন একই নদী বদলে বদলে নেয় তার গতিপথ, কিন্তু জল থেকে যায় একই নোনতা।

২০২২ বিশ্বকাপ জিতে মেসি উপহার দিয়েছিলেন আনন্দাশ্রু। এবার বিশ্বকাপে মিসরের বিপক্ষে ঘুরে দাঁড়িয়ে জিতেও কেঁদেছেন মেসি। সেই কান্না যদি হয় স্বস্তি মেশানো আনন্দের, ফাইনালে শেষের কান্না তাহলে অস্তাচলে ডুবু ডুবু সূর্যের আলো ফুরিয়ে যাওয়ার ব্যথা।

সূর্য যেমন সারা দিন আলো বিলিয়ে গোধূলিলগ্নে রিক্ত হাতে ফেরে, মেসির পথটাও কি তেমন নয়! ৩৯ বছরে এসে শেষের লগ্নে বিশ্বকাপ থেকে কিছুই পাওয়া হলো না। না গেল শিরোপা ধরে রাখা, গোল্ডেন বল কিংবা গোল্ডেন বুটমিলল না কিছুই।

ক্যারিয়ারে প্রায় এমন কিছুই নেই, যা জেতেননি। বিশ্বকাপ ট্রফি থেকে এই টুর্নামেন্টের অনেক অনেক রেকর্ডও তাঁর। আছে দুই রকম অভিজ্ঞতাও হারের বেদনায় যেমন নীল হয়েছেন, তেমনি ভেসে গেছেন চরম আনন্দেও। তাই ভাবতে পারেন, মেসির কান্নায় আর নতুন কী!

পাল্টা প্রশ্ন করা যায়। বাড়িতে বিশ্বকাপ জয়ের পদক রেখে এসে গলায় রানার্সআপের পদক ওঠায় যিনি কাঁদেন, তাঁকে কি তখন আর দশজন অল্প বয়সী সাধারণ আর্জেন্টাইন সমর্থকের মতোই লাগে না? যাঁরা হারের ব্যথায় কিংবা গোলের আনন্দে চোখের অশ্রু ছেড়ে দেন অবলীলায়। ২১ বছরের সোনা ফলানো ক্যারিয়ার শেষেও যিনি এভাবে কাঁদতে পারেন, আকাশি-সাদা জার্সির জন্য তাঁর আবেগ ঠিক কতটা গভীর, ভাবা যায়!

লিওনেল স্কালোনি সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, মেসির সঙ্গে তাঁর এ নিয়ে কথা হয়নি। তবে মেসিকে নিয়ে নিজের ভাবনাটা বলেছেন আর্জেন্টিনা কোচ, ‘তাঁর বয়স এখন ৩৯ বছর। অবিশ্বাস্য! তাকে নতুন করে আবিষ্কার করার মতো কিছু নেই। সে যত দিন চাইবে তত দিন খেলবে, এ বিষয়ে আমি পরিষ্কার। বাকি খেলোয়াড় ও পাশে থাকা সবাই তাকে সমর্থন দিয়ে যাবে।’

স্কালোনির পরের কথাটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ, ‘আমি নিশ্চিত, সবাই তাকে নিয়ে গর্ববোধ করবে। কারণ, সেই ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড়।’

ফিফা চাইলে বিশ্বকাপে দলের সংখ্যা আরও বাড়াতে পারে। কিন্তু আগামী দিনগুলোতে মেসিহীন বিশ্বকাপের কথা ভেবে কোকিলহীন বসন্তকে দেখার দুঃখই জাগে। ফুটবলও কত রসিক! ‘ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড়’কেও কখনো কখনো ফিরতে হয় খালি হাতে।

আরও পড়ুন

লোড হচ্ছে...