নান্দনিক, সাশ্রয়ী ও টেকসই স্থাপত্যের নকশা করে যাচ্ছেন স্থপতি : রাফি মাহমুদ
প্রকাশ:
6
রাফি মাহমুদ। বাংলাদেশের একজন স্বনামধন্য স্থপতি। দীর্ঘ দুই দশকের ও বেশি সময় ধরে আধুনিক স্থাপত্য শিল্পে নান্দনিক, সাশ্রয়ী ও টেকসই স্থাপনার নকশা তৈরি করে যাচ্ছেন। তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এর স্থাপত্য বিভাগ থেকে পড়াশোনা করেছেন। তাঁর রয়েছে “ডি ফর্ম” নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার এবং প্রধান আর্কিটেক্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন স্থপতি রাফি মাহমুদ। এ যাবৎ তিনি বেশ কিছু নান্দনিক স্থাপনার নকশা ও ইন্টেরিয়র করেছেন। স্থাপত্য চর্চার পাশাপাশি এই স্থপতি চিত্রশিল্পচর্চা করে যাচ্ছেন নিয়মিত। আমেরিকায় একাধিক আন্তর্জাতিক চিত্রকর্ম প্রতিযোগিতায় রাফির কাজ পুরস্কৃত হয়েছে। এছাড়াও স্পেনের বার্সেলোনা শহরে একটা আর্ট রেসিডেন্সি প্রোগ্রামে তাঁর চিত্রকর্ম প্রদর্শনী হয়। এবার শাহ্ সিমেন্ট নির্মাণে আমিতে স্বনামধন্য এই স্থপতিকে নিয়ে প্রতিবেদন। লিখেছেন-মোহাম্মদ তারেক
বাংলাদেশের আবহাওয়া, জলবায়ু ও প্রকৃতিকে গুরুত্ব দিয়ে প্রতিটি নকশায় নজর দেন স্থপতি রাফি মাহমুদ। এই স্থপতি তাঁর কাজ সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে করতে ভালোবাসেন। পেশার কাছে দায়বদ্ধ থেকে সেটাকে সততার সঙ্গে শেষ করতে চান তিনি। রাফি মাহমুদ ২০০৩ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েট এর স্থাপত্য বিভাগ থেকে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।
পাশ করে বের হওয়ার পর তিনি প্রথমে যোগ দেন অফিস এন্ড হোম সলিউশন প্রাইভেট লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান। ২০০৭ সালে নিজে গড়ে তোলেন “ডি ফর্ম” নামের একটি প্রতিষ্ঠান। ২০১৩ সালে রাফি মাহমুদ সিনিয়র স্থপতি হিসেবে যোগ দেন সানমার গ্রুপ এ । ২০১৫ সালে ইউনাইটেড গ্রুপে সিনিয়র আর্কিটেক্ট হিসেবে যোগ দেন। ২০১৬ সালে এই স্থপতি চাকরি ছেড়ে দিয়ে নতুন আঙ্গিকে ঢেলে সাজান “ডি ফর্ম” প্রতিষ্ঠানটি। এই প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়েই তাঁর স্থাপত্য চর্চা প্রকৃত অর্থে নিজস্ব শক্তি খুঁজে পায়। এই স্থপতির কাজের পরিধি উচ্চ ভবন বাণিজ্যিক স্থাপনা থেকে শুরু করে পাঁচ তারকা হোটেল, হলিডে হোম, ব্যাংক, রেস্টুরেন্ট ও ব্যক্তিগত আবাসন পর্যন্ত বিস্তৃত।
তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে- কক্সবাজারে ২ লাখ স্কয়ার ফিটের পাঁচ তারকা হোটেল, মহাখালী ডি ও এইচ এস এ ১০ তলা আবাসিক ভবন, মনিপুরি পাড়ায় ৬ তলা আবাসিক ভবন, শ্রীপুরে দুই তলা ডুপ্লেক্স আবাসিক ভবন, গোপালগঞ্জে ডুপ্লেক্স হলিডে হোম, জয়পুরহাটে দুই তলা আবাসিক ভবন
চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামীতে ২২ তলা কনডমনিয়াম প্রজেক্ট, গুলশান-১ রংধনু মাল্টিমিডিয়া অফিসের ইন্টেরিয়র ডিজাইন, গুলশান এভিনিউ ও বসুন্ধরায় ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের কর্পোরেট হেড অফিসের ইন্টেরিয়র, কর্পোরেট ট্রেনিং সেন্টার সহ বেশ কিছু স্থাপনার নকশা ও ইন্টেরিয়র করেছেন।
ইটের পর ইট গেঁথে শুধু দেয়াল তৈরি হয় না, তৈরি হয় আবেগ, স্মৃতি আর শিকড়ের গল্প। কর্মব্যস্ত শহুরে জীবনের ক্লান্তি মুছে প্রকৃতির কোলে একটু শান্তির খোঁজে মানুষ বারবার ফিরে যায় মাটির টানে, নিজ গ্রামে। আর সেই ফেরার আকুতিকে এক চমৎকার স্থাপত্যশৈলীতে রূপ দিয়েছেন স্থপতি তার নতুন “হলিডে হোম” প্রকল্পে। আবহমান বাংলার আধুনিক রূপান্তর হলো এই দৃষ্টিনন্দন হলিডে হোম। ঐতিহ্যের আঙিনায় আধুনিকতার ছোঁয়া।
গোপালগঞ্জের সবুজ শ্যামল মায়াবী পরিবেশে নির্মিত ২০০০ স্কয়ারফিটের এই ডুপ্লেক্স হলিডে হোমটি ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ আবহের সাথে আধুনিক জীবনযাত্রার এক অপূর্ব মেলবন্ধন। “হলিডে হোম” প্রজেক্টটি সম্পর্কে স্বনামধন্য স্থপতি রাফি মাহমুদ বলেন, ডিজাইনের মূল ভাবনাটি এসেছে আবহমান বাংলার চিরায়ত ‘ঘর-বাড়ি’র ধারণা থেকে। গ্রামীণ দো-চালা ঘরের চিরচেনা রূপটিকে সমসাময়িক স্থাপত্যের পরিশীলিত ভাষায় এখানে উপস্থাপন করা হয়েছে। এটি কেবল একটি থাকার জায়গা নয়, বরং প্রকৃতির সাথে মিতালি করার এক অনন্য মাধ্যম।
স্থাপত্যশৈলী ও অভ্যন্তরীণ বিন্যাস: দক্ষিণমুখী এই ডুপ্লেক্স ভবনটিতে প্রবেশ করতেই চোখ জুড়িয়ে যায় এর সুপরিকল্পিত স্পেস ম্যানেজমেন্ট দেখে। আলো-বাতাসের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করতে পুরো বাড়িতে রাখা হয়েছে প্রশস্ত জানালা। ভবনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ এর ডাবল হাইট স্পেস, যা ঘরের ভেতরের পরিবেশকে করে তুলেছে অনেক বেশি রাজকীয় ও উন্মুক্ত। এই ডাবল হাইট স্পেসের মধ্য দিয়ে উঠে গেছে একটি দৃষ্টিনন্দন সিঁড়ি, যা নিচতলা ও দোতলার মধ্যে এক চমৎকার চাক্ষুষ সংযোগ (ঠরংঁধষ ঈড়হহবপঃরড়হ) তৈরি করেছে। পারিবারিক গোপনীয়তা ও স্বাচ্ছন্দ্য বজায় রেখে পুরো প্রকল্পটিতে রয়েছে-চারটি শয়নকক্ষ: পর্যাপ্ত আলো- বাতাসযুক্ত সুপরিসর বেডরুম। একটি স্টাডি রুম: নিরিবিলিতে কাজ করা বা বই পড়ার জন্য আদর্শ স্থান। চারটি বাথরুম আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত স্নানাগার।
দুটি খোলা বারান্দা: সকালের কড়া চা বা বিকেলের আড্ডার জন্য উন্মুক্ত কোণ।
সুপরিসর উন্মুক্ত ট্যারেস: রাতের তারা দেখার বা জোছনা বিলাস করার জন্য এক টুকরো খোলা আকাশ।
আবহমান বাংলার ‘উঠান’ ও ডাইনিং ব্লক বাঙালি সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো ‘উঠান’। এই প্রকল্পে সেই ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করা হয়েছে। মূল দক্ষিণমুখী ভবনের সাথে সংযুক্ত রয়েছে একটি সবুজ মায়াবী উঠান। এই উঠানের কোল ঘেঁষেই তৈরি করা হয়েছে একটি পৃথক একতলা বাড়ি, যেখানে স্থান পেয়েছে রান্নাঘর এবং ডাইনিং স্পেস।
গ্রামীণ বাড়িতে যেভাবে মূল ঘরের বাইরে রান্না ও খাওয়ার ব্যবস্থা থাকে, ঠিক সেই ধারণাটিকেই এখানে আধুনিক ফর্মে আনা হয়েছে। ফলে রান্নার ধোঁয়া বা উত্তাপ মূল ঘরে প্রবেশ করে না, আবার ডাইনিংয়ে বসে উঠানের সবুজ প্রকৃতির রূপ উপভোগ করা যায়।
উপাদানের খেলা: প্রকৃতি ও আধুনিকতার মেলবন্ধন। ভবনটির বাহ্যিক অবয়ব বা এক্সটেরিয়রে কৃত্রিমতার কোনো স্থান নেই। স্থপতি এখানে বেছে নিয়েছেন প্রকৃতির নিজস্ব রঙ এবং উপাদান।
ফেয়ার ফেস কনক্রিট: যা ভবনটিকে দিয়েছে আধুনিক ও মিনিমালিস্টিক লুক।
কাঠ ও কাঠ রঙ্গা টাইলস: প্রকৃতির উষ্ণতা ধরে রাখতে এক্সটেরিয়র ও ইন্টেরিয়রের বিভিন্ন অংশে কাঠের ব্যবহার করা হয়েছে। কাঠ রঙ্গা জানালার গ্লাসের ফ্রেম: যা দূর থেকে গ্রামীণ আবহের সাথে মিশে যায়। সিরামিকের দো-চালা ছাদ টাইল: গ্রামীণ দো-চালা ছাদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে এখানে ব্যবহার করা হয়েছে সিরামিকের তৈরি দৃষ্টিনন্দন ছাদ টাইল। এটি একদিকে যেমন তীব্র রোদে ঘরকে ঠা-া রাখে, অন্যদিকে বৃষ্টির দিনে তৈরি করে নস্টালজিক আবহ।
উপসংহার: প্রকৃতিকে আড়াল করে নয়, বরং প্রকৃতিকে সাথে নিয়ে কীভাবে বাঁচা যায়-গোপালগঞ্জের এই হলিডে হোমটি তারই এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ। আধুনিক সুযোগ-সুবিধার সবটুকু নিশ্চিত করেও এর অবয়বে মিশে আছে চিরচেনা বাংলার মাটির গন্ধ। স্থপতির পরিমিতিবোধ, উপাদানের সঠিক ব্যবহার এবং ঐতিহ্যকে ধারণ করার প্রয়াস এই প্রকল্পটিকে সমসাময়িক স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন করে তুলেছে।
যেখানে আধুনিকতার নীরবতা আর গ্রাামের স্মৃতি একসাথে শ্বাস নেয়। উঠানে নামা আলো, খোলা বাতাস একসাথে গ্রামবাংলার স্মৃতিকে আধুনিক জীবনের সঙ্গে খুব স্বাভাবিকভাবে মিলিয়ে দিয়েছে। এই স্থপতি মনে করেন, ভালো ডিজাইন মানুষের জীবনকে সহজ করে, আর এই ঘরটি প্রতিদিনের চলার পথে স্বস্তি, শান্তি আর আপন অনুভূতির জায়গা তৈরি করে।