
আমাদের ঈদ উৎসব
আমাদের দেশে ঈদ উৎসবই বড় উৎসব। আড়াই মাসের ব্যবধানে দুটি ঈদ। ঈদুল ফিতর। ঈদুল আজহা। রমজানের একমাস সিয়াম সাধনার পর, অর্থাৎ একমাস রোজা রাখার পর.....

বাংলাদেশকে একসময় বিশ্বের দরিদ্র ও সহায়তানির্ভর দেশ হিসেবে উপস্থাপন করা হতো। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি রাষ্ট্র হিসেবে যাত্রা শুরু করা দেশটি আজ উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর ক্ষমতায়ন ও সামাজিক উদ্যোগের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচিত উদাহরণ। চলমান সেই যাত্রার পেছনে যেসব প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, রেখে চলছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ্। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সাময়িকী টাইম মানবসেবায় বিশ্বের সেরা একশ ব্যক্তিত্বের তালিকায় তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত করেছে। এটি শুধু একজন ব্যক্তির অর্জন নয়; বরং বাংলাদেশের উন্নয়ন দর্শন, স্থানীয় নেতৃত্বভিত্তিক সামাজিক পরিবর্তনের মডেল এবং দীর্ঘদিনের মানবিক কাজের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
টাইম তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, বৈদেশিক সহায়তায় বড় ধরনের কাটছাঁটের পর বিশ্ব এখন উন্নয়ন সহযোগিতার নতুন ও কার্যকর মডেল খুঁজছে। সেই জায়গায় ব্র্যাক এবং আসিফ সালেহ্ হয়তো একটি কার্যকর উত্তর দিতে পারেন। মূলত কয়েকটি কারণে তাঁকে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রথমত, উন্নয়ন খাতে স্থানীয় নেতৃত্বভিত্তিক মডেলকে বৈশ্বিক আলোচনায় তুলে ধরার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, অনুদাননির্ভর কাঠামোর বাইরে গিয়ে বহুমুখী অর্থায়ন ব্যবস্থা তৈরি করে ব্র্যাককে টেকসই অবস্থানে রাখার কৌশল আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। তৃতীয়ত, দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাকে একসঙ্গে যুক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক পরিবর্তনের যে মডেল ব্র্যাক অনুসরণ করছে, সেটিকে তিনি নতুনভাবে আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরেছেন। চতুর্থত, উন্নয়নকে দাতব্য নয় বরং মানুষের অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করার কারণে তিনি বৈশ্বিক উন্নয়ন আলোচনায় আলাদা গুরুত্ব পেয়েছেন।
আসিফ সালেহ্র পেশাগত জীবনও বেশ ব্যতিক্রমধর্মী। উন্নয়ন খাতে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠার আগে তিনি দীর্ঘ সময় আন্তর্জাতিক করপোরেট ও প্রযুক্তিখাতে কাজ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনা স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার বিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করার পর তিনি পরে ঘবি ণড়ৎশ টহরাবৎংরঃু ঝঃবৎহ ঝপযড়ড়ষ ড়ভ ইঁংরহবংং থেকে এমবিএ করেন। কর্মজীবন শুরু করেন প্রযুক্তি ও আর্থিক খাতে। নিউইয়র্ক ও লন্ডনে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকসে প্রায় এক দশকের বেশি সময় কাজ করেছেন। এ ছাড়াও তিনি ওইগ, ঘড়ৎঃবষ এবং এষধীড় ডবষষপড়সব এও কাজ করেন। সেখানে তিনি প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। আন্তর্জাতিক করপোরেট পরিবেশে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁকে অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে বাস্তব ধারণা দেয়।
দীর্ঘ সময় বিদেশে কাজ করার পর তিনি দেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর ভাষায়, বাংলাদেশ দ্রুত বদলাচ্ছিল এবং সেই পরিবর্তনের অংশ হওয়ার সুযোগ তিনি হাতছাড়া করতে চাননি। দেশে ফিরে তিনি প্রথমে যুক্ত হন প্রযুক্তিনির্ভর সামাজিক উদ্যোগ ও নীতিনির্ধারণী কাজের সঙ্গে। একসময় জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় ‘অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন’ কর্মসূচির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। তখন বাংলাদেশে ডিজিটাল সংযোগ বিস্তার, সরকারি সেবাকে প্রযুক্তিনির্ভর করা এবং কম খরচে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানোর বিষয়ে কাজ করেন।
এরপর তিনি শিক্ষাবিষয়ক সামাজিক উদ্যোগ ‘খান একাডেমি বাংলা’র সঙ্গেও সম্পৃক্ত হন। ইংরেজিভাষী শিক্ষাসামগ্রী বাংলায় অনুবাদ ও ডিজিটাল শিক্ষার সুযোগ বিস্তারে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তিকে কীভাবে প্রান্তিক মানুষের কাজে লাগানো যায়, সেই ভাবনা তখন থেকেই তাঁর কাজে স্পষ্ট হতে শুরু করে।
আসিফ সালেহ্ ২০১১ সালে ব্র্যাকের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হন। শুরুতে তিনি ব্র্যাকের উদ্ভাবন, প্রযুক্তি ও যোগাযোগভিত্তিক বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে কাজ করেন। পরে ধীরে ধীরে সংস্থাটির কৌশলগত পরিকল্পনা ও আন্তর্জাতিক কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। ২০১৯ সালে তিনি ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন। এমন একটি সময়ে তিনি নেতৃত্বে আসেন, যখন বিশ্বজুড়ে উন্নয়ন সহযোগিতার ধরন বদলাচ্ছিল, অর্থায়নে অনিশ্চয়তা বাড়ছিল এবং জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈষম্যের মতো সংকট আরও তীব্র হচ্ছিল।
ব্র্যাকের নেতৃত্বে এসে তিনি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন স্থানীয় নেতৃত্বভিত্তিক উন্নয়ন ধারণাকে। তাঁর মতে, উন্নয়ন প্রকল্প দূরের কোনো শহরে বসে পরিকল্পনা করলে মানুষের বাস্তব সমস্যাকে পুরোপুরি বোঝা যায় না। এই কারণে তিনি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে স্থানীয় অভিজ্ঞতা ও কমিউনিটির অংশগ্রহণকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখার কথা বলেছেন। তাঁর এই অবস্থান আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অঙ্গনে বিশেষভাবে আলোচিত হয়। কারণ, বহু বছর ধরে উন্নয়ন সহযোগিতার বড় অংশ নিয়ন্ত্রিত হয়েছে বৈশ্বিক উত্তরের দেশগুলো থেকে। আসিফ সালেহ্ সেই কাঠামোর ভেতরে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলেছেন।

তাঁর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো উন্নয়ন সংস্থার অর্থনৈতিক টেকসই কাঠামো নিয়ে কাজ করা। তিনি মনে করেন, শুধু অনুদানের ওপর নির্ভরশীল থাকলে দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়ন কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া কঠিন। তাই ব্র্যাকের ক্ষুদ্রঋণ, সামাজিক উদ্যোগ, কৃষিভিত্তিক কার্যক্রম ও বিভিন্ন বিনিয়োগ কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করার ওপর জোর দেন। টাইমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈদেশিক সহায়তা কমে যাওয়ার পরও ব্র্যাক টিকে থাকতে পেরেছে মূলত এই বহুমুখী অর্থনৈতিক মডেলের কারণে।
করোনাভাইরাস মহামারির সময়ও তাঁর নেতৃত্ব বিশেষভাবে আলোচিত হয়। সে সময় ব্র্যাক শুধু স্বাস্থ্যসচেতনতা নয়, খাদ্য সহায়তা, ডিজিটাল শিক্ষা, নগদ সহায়তা ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ পরিচালনা করে। প্রান্তিক মানুষের কাছে দ্রুত সহায়তা পৌঁছে দিতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর দিকেও জোর দেন তিনি। তাঁর মতে, প্রযুক্তি তখনই অর্থবহ, যখন তা মানুষের বাস্তব সমস্যার সমাধানে কাজে লাগে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ধীরে ধীরে তাঁর পরিচিতি বাড়তে থাকে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক আলোচনায় তিনি উন্নয়ন সহযোগিতার নতুন কাঠামো নিয়ে কথা বলেন। বিশেষ করে তিনি বারবার বলেছেন, উন্নয়নকে দাতব্য কাজ হিসেবে দেখা হলে মানুষ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। বরং উন্নয়ন এমন হওয়া উচিত, যেখানে মানুষ নিজের পরিবর্তনের সক্রিয় অংশীদার হয়। তাঁর এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়। কারণ, বৈশ্বিক সহায়তার প্রচলিত কাঠামো নিয়ে তখন নানা প্রশ্ন উঠছিল।
ব্র্যাকের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর তিনি ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সংস্থাটির অন্যতম মুখ হয়ে ওঠেন। স্বাধীনতার পর শরণার্থীদের সহায়তার মাধ্যমে যাত্রা শুরু করা ব্র্যাক এখন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন সংস্থা। এশিয়া ও আফ্রিকার বহু দেশে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বিস্তৃত। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, নারীর ক্ষমতায়ন, দক্ষতা উন্নয়ন, ক্ষুদ্রঋণ ও দারিদ্র্য বিমোচনে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে সংস্থাটি। কিন্তু আসিফ সালেহ্র নেতৃত্বে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে, তা হলো স্থানীয়ভাবে পরিচালিত উন্নয়ন মডেল।
তিনি মনে করেন, উন্নয়ন কোনো দাতব্য কাজ নয়। টাইমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, “দাতব্য কর্মকা-ে মানুষ কেবল সহায়তা গ্রহণকারী হয়ে থাকে। আমরা এমন একটি পদ্ধতিকে উৎসাহিত করি, যেখানে মানুষ প্রতিটি কাজে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হিসেবে যুক্ত থাকে।” এই বক্তব্যের কারণেই তাঁকে এখন বৈশ্বিক উন্নয়ন অঙ্গনে আলাদা করে দেখা হচ্ছে। কারণ, তিনি সহায়তার প্রচলিত কাঠামোর বদলে মানুষের নিজস্ব সক্ষমতা ও অংশগ্রহণকে সামনে আনছেন। এই বক্তব্যের মধ্যেই তাঁর উন্নয়ন দর্শনের মূল বিষয়টি স্পষ্ট হয়। তাঁর মতে, মানুষের সমস্যার সমাধান বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া যায় না; বরং মানুষকে সঙ্গে নিয়ে তাদের বাস্তবতা বুঝে কাজ করতে হয়। এই চিন্তাধারাই ব্র্যাকের বহু কর্মসূচির ভিত্তি। ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি থেকে শুরু করে নারী উদ্যোক্তা তৈরি কিংবা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষা কার্যক্রম—সব ক্ষেত্রেই অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বর্তমান বিশ্বে উন্নয়ন খাতের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো অর্থায়ন। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে বৈদেশিক সহায়তার বাজেট কমছে। যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে অনেক দেশ আগের মতো উন্নয়ন সহায়তা দিতে আগ্রহী নয়। এই বাস্তবতায় বহু আন্তর্জাতিক সংস্থা আর্থিক চাপে পড়েছে। কিন্তু ব্র্যাক তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। কারণ, তারা দীর্ঘদিন ধরেই বহুমুখী অর্থায়ন কাঠামো তৈরি করেছে। অনুদানের পাশাপাশি ক্ষুদ্রঋণ, সামাজিক উদ্যোগ, বিনিয়োগ ও বিভিন্ন ব্যবসায়িক কার্যক্রম থেকে আয় করে প্রতিষ্ঠানটি। টাইম তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, বৈদেশিক সহায়তা কমে যাওয়ার পরও ব্র্যাক টিকে থাকতে পেরেছে মূলত এই বহুমুখী অর্থনৈতিক কাঠামোর কারণে। এই মডেলটিকেই তারা উন্নয়ন সহযোগিতার ভবিষ্যতের একটি সম্ভাব্য পথ হিসেবে দেখেছে।
আসিফ সালেহ্ মনে করেন, উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে শুধু অনুদানের ওপর নির্ভরশীল থাকলে চলবে না। সমাজের ভেতরে এমন অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যা নিজেই টেকসই হবে। এই ধারণা থেকেই ব্র্যাক বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগ গড়ে তুলেছে। হস্তশিল্প, কৃষি, দুগ্ধ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণসহ নানা খাতে তাদের কার্যক্রম রয়েছে। এসব উদ্যোগ থেকে অর্জিত আয় আবার সামাজিক উন্নয়ন কার্যক্রমে ব্যয় করা হয়। ফলে একটি স্বনির্ভর কাঠামো তৈরি হয়েছে।
উন্নয়ন সহযোগিতার বর্তমান কাঠামো নিয়েও তিনি বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, বৈশ্বিক উত্তরের দেশগুলোতে বসে এমন অনেক উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি হয়, যেগুলোর সঙ্গে বাস্তব সমস্যার জায়গার দূরত্ব অনেক বেশি। তিনি বলেছেন, “যারা সমস্যার সবচেয়ে কাছাকাছি থাকে, তারাই সবচেয়ে কার্যকর সমাধান দিতে পারে।” তাঁর মতে, স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শুধু বাস্তবায়নকারী নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের অংশীদার হিসেবেও দেখতে হবে।
প্রযুক্তি নিয়েও তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা। তিনি মনে করেন, প্রযুক্তি শুধু শহরের সুবিধাভোগী মানুষের জন্য নয়; বরং প্রান্তিক মানুষের ক্ষমতায়নের মাধ্যম হওয়া উচিত। করোনার সময় ডিজিটাল শিক্ষা, স্বাস্থ্য তথ্য ও সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনায় ব্র্যাক যেভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে, সেখানে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি বারবার বলেছেন, প্রযুক্তিকে যদি অন্তর্ভুক্তিমূলকভাবে ব্যবহার করা যায়, তবে এটি বৈষম্য কমানোর শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে।

শিক্ষা নিয়েও তাঁর ভাবনা স্পষ্ট। তিনি মনে করেন, শুধু পরীক্ষাভিত্তিক শিক্ষা দিয়ে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব নয়। দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে শিক্ষা কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশের বহু দরিদ্র ও ঝরে পড়া শিশুর জন্য ব্র্যাক যে বিকল্প শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করেছিল, সেটিকে তিনি সামাজিক অন্তর্ভুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখেন। তাঁর মতে, শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য শুধু সনদ দেওয়া নয়; বরং মানুষকে আত্মবিশ্বাসী ও সক্ষম করে তোলা।
নারীর ক্ষমতায়ন নিয়েও আসিফ সালেহ্ দীর্ঘদিন ধরে কথা বলে আসছেন। তাঁর মতে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি হলো নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ। তৈরি পোশাক শিল্প থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কার্যক্রম-সব জায়গাতেই নারীর ভূমিকা দেশের অর্থনীতিকে বদলে দিয়েছে। তবে তিনি এটিও মনে করেন, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক পরিবার এখনো মেয়েদের বাইরে কাজ করতে দিতে চায় না। তাই শুধু অর্থনৈতিক সহায়তা নয়, সামাজিক মনোভাব পরিবর্তনের কাজও জরুরি।
একটি আন্তর্জাতিক আলোচনায় তিনি বলেছিলেন, “উন্নয়নকে আমরা অনেক সময় শুধু অর্থনৈতিক সূচকে দেখি। কিন্তু মানুষের মর্যাদা, আত্মবিশ্বাস ও অংশগ্রহণের বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।” এই বক্তব্য তাঁর কাজের দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ, ব্র্যাকের বিভিন্ন কর্মসূচিতে শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, সামাজিক সক্ষমতা তৈরির বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের জন্য এই স্বীকৃতির আরেকটি বড় তাৎপর্য রয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশকে প্রায়ই রাজনৈতিক অস্থিরতা, জলবায়ু ঝুঁকি বা শ্রমবাজারের আলোচনায় তুলে ধরা হয়। সেখানে মানবসেবা ও উন্নয়ন উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে একজন বাংলাদেশির বৈশ্বিক স্বীকৃতি দেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, টাইমের এই তালিকায় জায়গা পাওয়া প্রথম বাংলাদেশি তিনি। ফলে এটি কেবল ব্যক্তিগত অর্জন নয়; বরং বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিজ্ঞতারও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। এটি দেখায়, বাংলাদেশ শুধু সহায়তা গ্রহণকারী দেশ নয়; উন্নয়ন চিন্তা ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও নেতৃত্ব দিতে সক্ষম।
আসিফ সালেহ্র এই অর্জনের মধ্যে বাংলাদেশের দীর্ঘ উন্নয়ন যাত্রার প্রতিফলনও রয়েছে। একসময় যে দেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলা হয়েছিল, সেই দেশ আজ দারিদ্র্য কমানো, নারীর অংশগ্রহণ, সামাজিক উদ্যোগ ও মানবিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশ্বে আলোচিত উদাহরণ। ব্র্যাকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এই পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আর সেই অভিজ্ঞতাকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার ক্ষেত্রে আসিফ সালেহ্ এখন অন্যতম পরিচিত মুখ।
বিশ্ব এখন এক অনিশ্চিত সময় পার করছে। যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক সংকট ও বৈষম্য নতুন করে মানবিক বিপর্যয় তৈরি করছে। এই বাস্তবতায় উন্নয়ন সহযোগিতার পুরোনো কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এমন সময় টাইমের মতো একটি সাময়িকী যখন আসিফ সালেহ্কে মানবসেবায় বিশ্বের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের একজন হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, তখন সেটি শুধু একজন মানুষের সাফল্যের গল্প হয়ে থাকে না। এটি হয়ে ওঠে বাংলাদেশের উন্নয়ন দর্শনের বৈশ্বিক স্বীকৃতি।
সব মিলিয়ে, আসিফ সালেহ্র নাম টাইমের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া বাংলাদেশের জন্য গর্বের একটি মুহূর্ত। এটি প্রমাণ করে, স্থানীয় অভিজ্ঞতা, মানুষের অংশগ্রহণ ও টেকসই উন্নয়ন মডেল দিয়েও বিশ্বকে পথ দেখানো সম্ভব। আর সেই নতুন উন্নয়ন ভাবনার অন্যতম প্রতিনিধি হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশের এই উন্নয়নকর্মী।
আসিফ সালেহ’ র প্রতিক্রিয়া
অনেক ধন্যবাদ সবাইকে- এত ভালোবাসা আর শুভেচ্ছার জন্য। নাম আসাটা সম্মানের। কিন্তু সত্যি কথা হলো, এই স্বীকৃতি ব্র্যাকের প্রতিটি কর্মীর- যারা প্রতিদিন নিজের কমিউনিটির মানুষের পাশে থেকে কাজ করে যাচ্ছেন।
স্যার ফজলে হাসান আবেদ যে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন- সেটা বাঁচিয়ে রাখছি আমরা সবাই। প্রতিটা মুহূর্তে এই অবিশ্বাস্য মানুষটার ভাবনা চিন্তার কথা আর তার কাজের বিস্তৃত পরিধি দেখি, এখনও এত বছর পরেও পুলকিত হই।
আর আজও তার প্রয়োজনীয়তা খুঁজে পাই সব খানে। তার স্পর্শ পাই। আমার অশেষ সৌভাগ্য এমন একটা মানুষের সাথে কাজ করতে পেরেছি, তার তৈরি সংগঠনের কাজে লাগতে পেরেছি এবং এমন নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের সাথে কাজ করতে পারছি। কি দারুন একটা লড়ঁৎহবু!
সত্যি কথা বলতে কি-কাজটা সহজ না। অনেক জটিল। কিন্তু একদিনও সকালে উঠে মনে হয় না আজকে কাজে যাব না। এর কারণ এই কাজটা একটা সার্ভিস বা সেবার মত। যত নিজেকে দিই, তত পাই সন্তুষ্টি আর মানুষের ভালবাসা।
এই ছবিটা বাংলাদেশে ফিরে আসার পরে ২০০৯ সালে তার সাথে আমার প্রথম দেখা হওয়ার একটা ছবি। খুব প্রিয় একটা ছবি।
আর ২য়টা শেষ ছবি ওনার সাথে। আর তৃতীয়টি আমাদের তিনজনের। আমরা প্রাণপন চেষ্টা করে যাচ্ছি।
আবারও ধন্যবাদ।
আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...

আমাদের দেশে ঈদ উৎসবই বড় উৎসব। আড়াই মাসের ব্যবধানে দুটি ঈদ। ঈদুল ফিতর। ঈদুল আজহা। রমজানের একমাস সিয়াম সাধনার পর, অর্থাৎ একমাস রোজা রাখার পর.....

প্রিয়বন্ধু আফজাল হোসেনের পাশেই বসেছেন দেশখ্যাত কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার ইমদাদুল হক মিলন। প্রিয়বন্ধুর ঘাড়ে হাত রেখে পরশ দিচ্ছিলেন আর শুনছিলেন দু’জনেরই .....

ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করছে এআই প্রযুক্তি। এটা একটা পরিবর্তন। পকেটে টাকা না নিয়ে বাজারে গেলেন। প্রয়োজনীয় পণ্য সামগ্রী কিনবেন কি করে?

৭দিনে ৭সিনেমা ১৩ টেলিফিল্ম ১৬টি নাটকচ্যানেল আইতে ঈদের ৭দিন ব্যপি অনুষ্ঠানমালার আওতায় ৭টি সিনেমা, ১৩টি টেলিফিল্ম, ১০৬টি একক নাটক প্রচার হবে। পাশাপাশি.....

দীর্ঘ সাত বছর পর নতুন করে লাক্স সুপারস্টার পেল বাংলাদেশ। এর আগে এই প্রতিযোগিতার নামের সঙ্গে চ্যানেল আই যুক্ত ছিল........

স্পেনের বার্সেলোনায় “গ্লোবাল সিফুড এক্সপো ২০২৬”- এ অংশগ্রহণ করেছে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক এই প্রদর্শনীতে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো এর আর্থিক সহযোগিতায় একটি আকর্ষণীয় প্যাভিলিয়ন নিয়ে দেশের স্বনামধন্য ৮ টি প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করছে।

যুক্তরাষ্ট্রে সমাজতন্ত্রী ও কট্টর ইসলামপন্থী অভিবাসীদের নাগরিকত্ব বাতিলের প্রস্তাব মার্কিন কংগ্রেসে নতুন বিল

সিরাজগঞ্জের শহীদ এম মনসুর আলী মেডিকেল কলেজের নাম পরিবর্তন করেছে সরকার। মেডিকেল কলেজটির নতুন নাম রাখা হয়েছে, সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজ। মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়।