Ad space

দর্শককে নতুন ভাবে ভাবতে উদ্ধুব্দ করার দায়িত্বও নির্মাতার

প্রকাশ:
7
Image

মেজবাউর রহমান সুমনের নতুন সিনেমা রইদ দেশে-বিদেশে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সুমন বললেন, রইদ পরিপূর্ণ প্রেমের গল্প; কিন্তু প্রেমের আড়ালে আমি আরও কিছু প্রশ্ন ও ভাবনার দিকে তাকানোর চেষ্টা করেছি। হাজার বছরের পুরোনো আখ্যান, ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা এবং নারী-পুরুষের সম্পর্ককে ঘিরে সমাজ ও রাজনীতির যে ধারণাগুলো তৈরি হয়েছে, সেগুলোও আমাকে ভাবিয়েছে। বিশেষ করে নারী সব সময় পুরুষের অধীন-এই প্রাচীন ধারণা বিভিন্ন দিক থেকে বোঝার চেষ্টা করেছি। সেই ভাবনা থেকেই সাধু ও পাগলির সম্পর্ককে দেখেছি। তাদের গল্প বলতে গিয়ে বারবার মনে হয়েছে, মানুষের প্রাপ্তি যতই হোক, আকাঙ্ক্ষার শেষ হয় না; বরং নতুন আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়। চিত্রনাট্য লিখতে গিয়ে এ অনুভূতিই আমাকে সবচেয়ে বেশি তাড়িত করেছে।

রইদ এর স্যুটিং এর সময় শুটিংয়ের জন্য শিল্পী ও কলাকুশলীদের নিয়ে মাসের পর মাস সিলেটের শাহ আরেফিন টিলায় থেকেছেন, এত সময় ধরে থাকতে হলো কেন?

এমন এক প্রশ্নের জবাবে সুমন বলেছেন, সাধু, পাগলিরা প্রকৃতিরই সন্তান। তাদের সত্যিকারভাবে বুঝতে হলে এবং পর্দায় বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে হলে সেই জীবনযাত্রার ভেতরে যাওয়া প্রয়োজন। সে কারণেই দীর্ঘ সময় একসঙ্গে থাকার পথটা বেছে নেওয়া। এর মধ্য দিয়েই চরিত্র ও গল্পের সঙ্গে সবার যোগাযোগ তৈরি হয়। আমার কাছে ছবি নির্মাণের জন্য এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের একটি। তবে এটি শুধু আমার ইচ্ছায় সম্ভব নয়, আমার টিমের মানুষজনও এ প্রক্রিয়ায় বিশ্বাস করে বলেই সম্ভব হয়।

সুমন বললেন, হাওয়া যে টিম মিলে তৈরি করেছিলাম, অল্প কয়েকজন বাদে প্রায় একই টিম রইদ নির্মাণ করেছে। ফলে কাজের বাইরে পারস্পরিক বিশ্বাস, বোঝাপড়া এবং একসঙ্গে থাকার কালচার তৈরি হয়েছে, দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে গেলে এই সম্পর্ক খুব জরুরি। আমি সিনেমা নির্মাণের পুরো যাত্রাটাই সবচেয়ে বেশি উপভোগ করি। চিত্রনাট্য লেখা থেকে শুরু করে প্রস্তুতি, শিল্পী ও কলাকুশলীদের সঙ্গে সময় কাটানো, শুটিং-পুরো সময়টাই আমার কাছে সবচেয়ে আনন্দের। ছয় মাস, আট মাস বা দশ মাস-যত দীর্ঘই হোক, এ সময়ই শেষ পর্যন্ত স্মৃতি হয়ে আমার সঙ্গে থাকে।

Image

‘হাওয়া’র সাফল্যের পর দর্শক প্রত্যাশার চাপও ছিল কি? এই প্রশ্নের জবাবে সুমন বললেন, হাওয়ার সাফল্যকে আমি চাপ হিসেবে নিতে চাইনি। বরং সেখান থেকে সাহসই পেয়েছি। হাওয়া নির্মাণের সময় আমরা বাংলা সিনেমার প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে একটি গল্প বলার চেষ্টা করেছিলাম। দর্শক সেটাকে গ্রহণ করেছিলেন। তাঁদের ভালোবাসা আমাকে এই বিশ্বাস দিয়েছে, আরও ভিন্নধর্মী গল্পও দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। আমি কখনোই মনে করি না, দর্শক বুঝবেন না বা জটিল কোনো ভাবনা গ্রহণ করতে পারবেন না। বরং দর্শককে নতুনভাবে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করার দায়িত্বও নির্মাতার।

প্রায়ই বলা হয়, ভালো গল্পের সংকট চলছে। আপনি কি গল্পের সংকট দেখেন? এই প্রশ্নের জবাবে মেজবাউর রহমান সুমন বললেন, আমাদের গল্পের সংকট নেই, বরং নিজের গল্প না করে আমরা অন্যের গল্প কিংবা অনুকরণের গল্প হয়ে উঠেছি। আমাদের নিজস্ব গল্প আমরা বিশ্বাস কম করেছি; কিন্তু খুব ভালো করে খেয়াল করলে দেখা যায়, আমাদের সিনেমার ইতিহাসে এমন উদাহরণ রয়েছে, যেখানে আমাদের গল্পই দর্শক হৃদয় জয় করেছে। ১৯৬৩ সালে রূপবান মুক্তির সময় উর্দু ও হিন্দি সিনেমার প্রভাব ছিল। তখনকার বাস্তবতায়ও রূপবান দর্শকপ্রিয় ও ব্যবসাসফল হয় এবং ছবির গল্পের কেন্দ্র একজন নারী চরিত্র। পরে সারেং বৌয়ের মতো আরও অনেক চলচ্চিত্র আমাদের এই অঞ্চলের সিনেমার গল্প বয়ানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আমার মনে হয়, আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো নিজেদের গল্পের শক্তির ওপর বিশ্বাস না থাকা। আমরা অনেক সময় পাশের দেশে কী হচ্ছে, ইউরোপে কী হচ্ছে বা হলিউডে কী হচ্ছে, সেদিকে বেশি মনোযোগ দিই। ফলে কখনো আমাদের সিনেমার নির্মাণভঙ্গি ইউরোপীয় হয়ে যায়, কখনো হলিউডি, আবার কখনো বলিউডি সিনেমার অনুকরণে চলে যায়। আমার কাছে মনে হয়, এই অনুকরণের প্রবণতাই আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট।

প্রসঙ্গক্রমে মেজবাউর রহমান সুমন বলেন, বিভিন্ন নির্মাতার ছবি তো আমি দেখেছি-একেবারে ছোটবেলা থেকে, যখন সিনেমাটা বোঝার চেষ্টা করেছি। হয়তোবা মনোজগতে প্রভাব ফেলেছেন স্কুলে পড়ার সময় দেখা সত্যজিৎ রায়, পরবর্তী সময়ে আরেকটু বড় হয়ে ঋত্বিক ঘটক, তারপরে ইউনিভার্সিটিতে উঠে আরও অনেক ধরনের সিনেমা দেখা। অনেক ধরনের ফিল্মমেকার আছেন, যাঁদের ছবি এখনো দেখি। নতুন কিছু নামও যুক্ত হয়েছে, যাঁদের ছবি হয়তো দেখেছি কিংবা দেখছি। চায়নিজ ফিল্মমেকার ঝাং ইমু, তাঁর ছবি আমার ভালো লাগে। আসঘর ফরহাদির ছবিও ভালো লাগে, কিংবা নুরি বিলগে জিলান, কিম কি দুক, আলেহান্দ্রো গনসালেস ইনারিতু, ওং কার-ওয়াই, স্ট্যানলি কুবরিক, বং জুন হো-এ রকম আরও অনেকের নাম বলা যেতে পারে। তাঁদের বা আরও অনেক ফিল্মমেকার আছেন, যাঁদের ছবি দেখার পর আমার মনোজগতে কোনো না কোনো ভাবনা তৈরি হয়েছে-এটুকু বলতে পারি। প্রভাব আছে কি না বলা খুব ডিফিকাল্ট, এটা মানুষ বলবে যে আমার সিনেমায় কিসের প্রভাব। আসলে গান, সিনেমা, পেইন্টিং-যা যা দেখি, সবকিছুরই প্রভাব আমার ছবিতে আছে। মানে সব প্রভাব নিয়েই আমার সিনেমা তৈরি হয়েছে বলে আমার বিশ্বাস।

নতুন কাজের প্রসঙ্গ উঠতেই মেজবাউর রহমান সুমন বললেন, আরও দুটি গল্প নিয়ে অনেক দিন ধরেই কাজ করছি। এর মধ্যে একটা গল্প হয়তো আমি ঠিক করে নেব। চিত্রনাট্যের কাজ শুরু হয়তো খুব তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে। তারপর হয়তো শুটিং করব। লম্বা প্রসেস, আমি ওই প্রসেসের মধ্যে হয়তো নেক্সট ইয়ারে ঢুকব। আমার প্রথম চলচ্চিত্র হাওয়া ছিল সমুদ্রযাত্রার গল্প আর রইদ মূলত দুজন মানুষের সম্পর্ক ও জীবনকে কেন্দ্র করে নির্মিত। তৃতীয় ও চতুর্থ ছবি হয়তো আরেকটা প্রেক্ষাপটে তৈরি হবে।কারণ, প্রতিটি ছবিতে তার নিজস্ব জগৎ তৈরি করতে হয়, সেই জগতের গল্পটা নির্মাতা হিসেবে আমার বলার ইচ্ছা। আমি যেসব বিষয় নিয়ে ভাবি, যেভাবে মানুষ ও জীবনকে দেখি, সেগুলোই আমার গল্প বলার ভেতরে প্রতিফলিত হবে। তবে সেটা সব সময় একই ধরনের আঙ্গিকে নয়। নতুন গল্পের প্রয়োজন হলে আমি আমার আগের চলচ্চিত্রের ধারা ভেঙে অন্য পথেও যেতে চাই।

কৃতজ্ঞতা: প্রথম আলো


 

আরও পড়ুন

লোড হচ্ছে...