Ad space

পরিবার পরিকল্পনা মানেই উন্নয়নে বিনিয়োগ:

প্রকাশ:
29
Image

সোশ্যাল মার্কেটিং কোম্পানির (এসএমসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তসলিম উদ্দিন খান বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা খাতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন পেশাজীবী। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি সামাজিক বিপণন, পরিবার পরিকল্পনা, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, পুষ্টি, স্বাস্থ্যসচেতনতা এবং বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে কাজ করে আসছেন। তাঁর নেতৃত্বে এসএমসি শুধু জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী সরবরাহকারী একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবেই নয়, বরং জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে সরকারের অন্যতম কৌশলগত অংশীদার হিসেবে কাজ করছে। তাঁর বিশ্বাস, স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হলে শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; বেসরকারি খাত, সামাজিক বিপণন এবং জনগণের অংশগ্রহণকে একই কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে হবে।

বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস উপলক্ষে আলোচনায় তসলিম উদ্দিন খানের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে-বাংলাদেশের পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির ইতিহাস কেবল সরকারি উদ্যোগের ইতিহাস নয়; এটি সরকার, উন্নয়ন সহযোগী এবং সামাজিক বিপণনের একটি যৌথ সাফল্যের গল্প।

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ১৯৭৫ সালে যখন সোশ্যাল মার্কেটিং কোম্পানির যাত্রা শুরু হয়, তখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ ছিল দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি। সদ্য স্বাধীন দেশের সীমিত সম্পদ, উচ্চ জন্মহার এবং ব্যাপক দারিদ্র্যের মধ্যে পরিবার পরিকল্পনাকে জাতীয় উন্নয়নের অপরিহার্য উপাদান হিসেবে দেখা হয়। সেই প্রেক্ষাপটেই এসএমসির জন্ম।

প্রতিষ্ঠানটির মূল লক্ষ্য ছিল সহজলভ্য, মানসম্মত এবং সাশ্রয়ী মূল্যে পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রী মানুষের হাতে পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই দায়িত্বের পরিধি অনেক বিস্তৃত হয়েছে। আজ এসএমসি শুধু জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি নয়; মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুস্বাস্থ্য, পুষ্টি, স্বাস্থ্যবিধি, মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, ডায়রিয়া প্রতিরোধ এবং বিভিন্ন জনস্বাস্থ্য কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।

Image

তসলিম উদ্দিন খান বলেন, পরিবার পরিকল্পনাকে কখনোই আলাদা একটি কর্মসূচি হিসেবে দেখা উচিত নয়। একজন নারীর সুস্বাস্থ্য, নিরাপদ মাতৃত্ব, শিশুর বেঁচে থাকা, পুষ্টি, পরিচ্ছন্নতা এবং স্বাস্থ্যসচেতনতা-সবকিছুই একই ধারার অংশ। তাই এসএমসিও ধীরে ধীরে পরিবার পরিকল্পনার পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের বৃহত্তর ক্ষেত্রকে কেন্দ্র করে নিজেদের কার্যক্রম বিস্তৃত করেছে।

তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে এসএমসির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জনের চিত্র। তিনি জানান, বর্তমানে বাংলাদেশে ব্যবহৃত মুখে খাওয়ার জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ির বড় একটি অংশ এসএমসির বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়। একইভাবে কনডম এবং ইনজেক্টেবল জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠানটির উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। তাঁর ভাষায়, দেশের অর্ধেকেরও বেশি দম্পতি কোনো না কোনো পর্যায়ে এসএমসির পণ্যের ওপর আস্থা রাখছেন। এই আস্থাকে তিনি শুধু বাজারের সাফল্য হিসেবে দেখেন না; বরং এটি জনস্বাস্থ্যের প্রতি মানুষের বিশ্বাসের প্রতিফলন বলে মনে করেন।

তসলিম উদ্দিন খানের বক্তব্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি স্বাস্থ্যকে সব সময় একটি সমন্বিত ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। উদাহরণ হিসেবে তিনি শিশু মৃত্যুহার কমানোর প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। একসময় ডায়রিয়া ছিল বাংলাদেশে শিশু মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। কিন্তু ওরস্যালাইন, স্বাস্থ্যসচেতনতা এবং সহজলভ্য চিকিৎসা ব্যবস্থার কারণে সেই পরিস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বদলেছে। তাঁর মতে, এটি দেখিয়ে দেয় যে সঠিক পণ্য, সঠিক বার্তা এবং মানুষের কাছে সহজে পৌঁছানোর ব্যবস্থা থাকলে জনস্বাস্থ্যে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব।

এসএমসির কাজের একটি বড় শক্তি হিসেবে তিনি তুলে ধরেন প্রতিষ্ঠানটির বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হাজার হাজার স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী, ফার্মেসি, চিকিৎসক এবং কমিউনিটি পর্যায়ের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির সংযোগ রয়েছে। ব্লু স্টার, গ্রিন স্টার, রোজ স্টার এবং গোল্ড স্টারের মতো বিভিন্ন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিবার পরিকল্পনা, মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুস্বাস্থ্য এবং স্বাস্থ্যসেবা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

Image

বিশেষ করে গ্রামীণ নারীদের নিয়ে গড়ে ওঠা গোল্ড স্টার নেটওয়ার্কের কথা বলতে গিয়ে তাঁর কণ্ঠে আলাদা আত্মবিশ্বাস ফুটে ওঠে। তাঁর মতে, এই উদ্যোগ শুধু স্বাস্থ্যপণ্য বিক্রির জন্য নয়; বরং নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলারও একটি কার্যকর মাধ্যম। হাজারো নারী নিজ নিজ এলাকায় স্বাস্থ্যপণ্য বিক্রি করছেন, মানুষকে সচেতন করছেন এবং একই সঙ্গে নিজেদের পরিবারের অর্থনীতিতেও অবদান রাখছেন।

তসলিম উদ্দিন খান মনে করেন, জনস্বাস্থ্য খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। স্বাস্থ্যসেবা শুধু চিকিৎসক বা হাসপাতালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পণ্য উৎপাদন, সরবরাহ, বিপণন, প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্যসচেতনতা এবং কমিউনিটি পর্যায়ের কার্যক্রম-সব মিলিয়ে এটি একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক কর্মকা-। এসএমসি সেই ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসের আলোচনায় তিনি আরেকটি বিষয় স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন-যোগাযোগ কৌশলের পরিবর্তন। একসময় বাংলাদেশে একটি বা দুটি টেলিভিশন চ্যানেলের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসচেতনতা তৈরি করা তুলনামূলক সহজ ছিল। কিন্তু বর্তমানে গণমাধ্যমের বিস্তার এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কারণে মানুষের কাছে পৌঁছানোর ধরন পুরোপুরি বদলে গেছে।

তাঁর মতে, আজকের তরুণ প্রজন্মকে আগের পদ্ধতিতে সচেতন করা সম্ভব নয়। তাদের জন্য নতুন ভাষা, নতুন মাধ্যম এবং নতুন ধরনের বার্তা প্রয়োজন। তাই স্বাস্থ্য যোগাযোগেও নিয়মিত পরিবর্তন আনতে হবে। তবে তিনি এটাও বলেন, মাধ্যম বদলালেও মূল লক্ষ্য একই রয়েছে-মানুষের কাছে নির্ভুল স্বাস্থ্যবার্তা পৌঁছে দেওয়া।

পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিতে উন্নয়ন সহযোগীদের ভূমিকাও তিনি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন। তাঁর মতে, অতীতে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদারদের সহায়তায় বাংলাদেশে পরিবার পরিকল্পনা এবং জনস্বাস্থ্য সচেতনতা দ্রুত বিস্তার লাভ করেছিল। সময়ের সঙ্গে সেই সহায়তার ধরন পরিবর্তিত হয়েছে। ফলে এখন দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা আরও বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে।

তসলিম উদ্দিন খানের দৃষ্টিতে বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নতুন প্রজন্ম। তিনি বলেন, একসময় যে জনগোষ্ঠী পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির আওতায় এসেছিল, তাদের জায়গায় এখন নতুন একটি প্রজন্ম এসেছে। তাদের কাছে নতুনভাবে পৌঁছাতে না পারলে অতীতের সাফল্য ধরে রাখা কঠিন হবে।

তিনি মনে করেন, স্বাস্থ্যসেবা শুধু সহজলভ্য হলেই যথেষ্ট নয়; মানুষকে সেই সেবা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করাও জরুরি। আর সেই কাজটি করতে পারে কার্যকর সামাজিক বিপণন। তাঁর ভাষায়, মানুষকে এমনভাবে স্বাস্থ্যবার্তা দিতে হবে, যাতে সেটি তাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে যায়।

তসলিম উদ্দিন খানের চিন্তায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ। তিনি বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে সরকারের একার পক্ষে প্রতিটি মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। আবার শুধু বেসরকারি খাতও এই দায়িত্ব পালন করতে পারবে না। তাই সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বিত অংশীদারিত্বই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পথ।

Image

এসএমসি সেই অংশীদারিত্বের একটি সফল উদাহরণ বলে তিনি মনে করেন। গত পাঁচ দশকে প্রতিষ্ঠানটি সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচির সম্পূরক হিসেবে কাজ করেছে। পরিবার পরিকল্পনা থেকে শুরু করে মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুপুষ্টি, মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, ডায়রিয়া প্রতিরোধ এবং স্বাস্থ্যবিধি-সব ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠানটি সামাজিক ব্যবসার ধারণাকে জনকল্যাণের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

তাঁর বক্তব্যে বারবার ফিরে আসে একটি শব্দ-’দায়বদ্ধতা’। তিনি মনে করেন, কোটি কোটি মানুষ যখন একটি প্রতিষ্ঠানের পণ্যের ওপর আস্থা রাখে, তখন সেই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বও বেড়ে যায়। তাই এসএমসির প্রতিটি উদ্যোগের কেন্দ্রে থাকে মানুষের স্বাস্থ্য, পণ্যের মান এবং দীর্ঘমেয়াদি আস্থা।

বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসকে তিনি একদিনের কর্মসূচি হিসেবে দেখেন না। তাঁর মতে, পরিবার পরিকল্পনা, মাতৃস্বাস্থ্য কিংবা জনস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ প্রতিদিনের বিষয়। বছরের একটি দিন সচেতনতা তৈরির উপলক্ষ হতে পারে, কিন্তু মানুষের আচরণ পরিবর্তন এবং স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার কাজ চলে বছরের প্রতিটি দিন।

তসলিম উদ্দিন খানের নেতৃত্বে এসএমসি আজ এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে সামাজিক বিপণন আর কেবল একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার একটি প্রতিষ্ঠিত অংশ। স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং টেকসই ব্যবসায়িক মডেল-এই তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার যে ধারণা তিনি তুলে ধরেন, সেটিই তাঁর নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য।

তাঁর মূল্যায়নে বাংলাদেশের পরবর্তী চ্যালেঞ্জ আর শুধু জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ নয়; বরং সুস্থ, দক্ষ এবং উৎপাদনশীল জনগোষ্ঠী গড়ে তোলা। আর সেই লক্ষ্য অর্জনে সরকার, উন্নয়ন সহযোগী, বেসরকারি খাত এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগের বিকল্প নেই। তাঁর বিশ্বাস, গত পঞ্চাশ বছরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নতুন প্রজন্মের জন্য আরও আধুনিক, আরও কার্যকর এবং আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।

আরও পড়ুন

লোড হচ্ছে...