Ad space

চাহিদার সংকট কাটলে বাংলাদেশের স্টিল শিল্পের সামনে রয়েছে বড় সম্ভাবনা

প্রকাশ:
7

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে স্টিল শিল্প একটি মৌলিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। অবকাঠামো নির্মাণ, আবাসন খাত, শিল্পকারখানা, সেতু, মহাসড়ক কিংবা বিদ্যুৎকেন্দ্র-প্রতিটি উন্নয়ন কর্মকা-ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই শিল্পের অবদান। গত কয়েক দশকে দেশের উদ্যোক্তারা নিজস্ব উদ্যোগে স্টিল খাতকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছেন, যেখানে দেশে ব্যবহৃত রড ও অধিকাংশ নির্মাণ-উপকরণের জন্য আর আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয় না। বর্তমানে দেশের বার্ষিক স্টিল উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টন হলেও প্রকৃত চাহিদা ৫০ লাখ টনের কাছাকাছি। ফলে শিল্পটি একদিকে অতিরিক্ত সক্ষমতার চাপ বহন করছে, অন্যদিকে উচ্চ সুদের হার, বিদ্যুৎ-জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, কর কাঠামোর পরিবর্তন, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের ধীরগতি এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতার মতো বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। খাতটির বর্তমান অবস্থা ও উত্তরণের পথ নিয়ে স্টিল শিল্পের চারজন শীর্ষ উদ্যোক্তা ও সংগঠক তাঁদের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন।

ড. সুমন চৌধুরী: ‘নীতিগত সহায়তা ছাড়া অতিরিক্ত সক্ষমতা বোঝায় পরিণত হচ্ছে’

বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব এবং আরআরএম স্টিলের চেয়ারম্যান ড. সুমন চৌধুরীর মতে, দেশের বর্তমান উৎপাদন সক্ষমতা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। স্বাধীনতার পর ছোট ছোট রি-রোলিং মিল থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক স্টিল কারখানা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ধীরে ধীরে এই সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা, মেগা প্রকল্প এবং ভবিষ্যৎ চাহিদার সম্ভাবনা বিবেচনা করেই উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করেছেন।

তাঁর ভাষায়, একটি দেশের উন্নয়নের সঙ্গে স্টিলের ব্যবহার সরাসরি সম্পর্কিত। মাথাপিছু স্টিল ব্যবহারের হারই অনেক ক্ষেত্রে একটি দেশের শিল্পায়ন ও অবকাঠামোগত অগ্রগতির সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু কোভিড-পরবর্তী অর্থনৈতিক অভিঘাত, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং আমদানিনির্ভর কাঁচামালের বাজারে অস্থিরতার কারণে বাংলাদেশের স্টিল শিল্প বড় ধরনের চাপে পড়েছে।

ড. সুমন চৌধুরী মনে করেন, বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ বাজার চাহিদা ও উৎপাদন সক্ষমতার মধ্যে বিশাল ব্যবধান। উদ্যোক্তারা ১ কোটি ২০ লাখ টন উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি করলেও বাজারে চাহিদা রয়েছে প্রায় ৫০ লাখ টনের। ফলে বিপুল পরিমাণ উৎপাদন অব্যবহৃত অবস্থায় রয়েছে।

তবে তাঁর মতে, সংকটের মূল কারণ শুধু চাহিদা নয়, নীতিগত সীমাবদ্ধতাও। তিনি বলেন, স্টিল শিল্প গত পাঁচ দশক ধরে সরকারের রাজস্ব আয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও এখনো এই খাত পর্যাপ্ত নীতিগত সুরক্ষা পায়নি। ভ্যাট, কর ও আমদানি শুল্ক কাঠামো এমনভাবে সংস্কার করা প্রয়োজন, যাতে বৈধ ব্যবসা পরিচালনা উৎসাহিত হয় এবং অসাধু প্রতিযোগিতা কমে।

তিনি আরও মনে করেন, শিল্প খাতের বড় সমস্যা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও অর্থায়নের উচ্চ ব্যয়। তাঁর মতে, স্টিল শিল্পের মতো মূলধননির্ভর খাতের জন্য এক অঙ্কের সুদে অর্থায়ন জরুরি। পাশাপাশি পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী না করলে উদ্যোক্তাদের ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে না। ফলে দীর্ঘমেয়াদে শিল্পের সম্প্রসারণও বাধাগ্রস্ত হবে।

মোহাম্মদ আব্দুস সালাম: ‘খরচ বাড়ছে, কিন্তু বাজারে সেই মূল্য সমন্বয় করা যাচ্ছে না’

বাংলাদেশ স্টিল মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এবং সালাম স্টিল অ্যান্ড রি-রোলিং মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুস সালাম নতুন বাজেটকে স্টিল শিল্পের জন্য উদ্বেগজনক বলে মনে করেন।

তাঁর মতে, বাজেটে ভ্যাট ও কর কাঠামোর পরিবর্তনের ফলে প্রতি টন স্টিল উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অতিরিক্ত ব্যয় যোগ হয়েছে। বিদ্যুৎ, গ্যাস, জ্বালানি এবং পরিবহন ব্যয়ের বৃদ্ধি মিলিয়ে উৎপাদন খরচ ক্রমাগত বাড়ছে। কিন্তু সেই অতিরিক্ত ব্যয় বাজারে সমন্বয় করা সম্ভব হচ্ছে না।

Image

তিনি ব্যাখ্যা করেন, পৃথিবীর অনেক দেশে উৎপাদন খরচ বাড়লে তার প্রভাব দ্রুত ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছে যায়। কিন্তু বাংলাদেশের স্টিল বাজারে পরিস্থিতি ভিন্ন। চাহিদা কমে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন খরচের নিচেও পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। এর ফলে বাজারে অস্বাভাবিক মূল্য প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে।

আব্দুস সালামের মতে, সমস্যার মূল কারণ ক্রেতার সংকট। বিশেষ করে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের গতি কমে যাওয়ায় স্টিলের বড় একটি বাজার সংকুচিত হয়েছে। অতীতে সরকারি প্রকল্পগুলো দেশের মোট স্টিল ব্যবহারের বড় অংশ জুড়ে থাকলেও বর্তমানে সেই ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে টিকে থাকতে পারবে না। কারণ স্টিল শিল্পে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ প্রয়োজন হয় এবং উৎপাদন বন্ধ রেখেও স্থায়ী খরচ বহন করতে হয়। শ্রমিকের বেতন, ব্যাংকঋণের সুদ, বিদ্যুৎ বিল ও অন্যান্য ব্যয় অব্যাহত থাকে।

তাঁর মতে, সরকারের সঙ্গে নিয়মিত ও বাস্তবভিত্তিক সংলাপের মাধ্যমে সমস্যাগুলোর সমাধান সম্ভব। তিনি বিশেষভাবে জোর দেন উন্নয়ন প্রকল্প পুনরায় সচল করার ওপর। তাঁর ভাষায়, “ডিমান্ড তৈরি করতে হবে, আর সেই ডিমান্ড তৈরির সবচেয়ে বড় মাধ্যম হচ্ছে উন্নয়ন কার্যক্রমের গতি বাড়ানো।”

শেখ ফজলুর রহমান বকুল: ‘দেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছে এই শিল্প, অথচ সুবিধা সবচেয়ে কম’

বাংলাদেশ স্টিল মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান এবং বিক্রমপুর স্টিল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ ফজলুর রহমান বকুলের মতে, বাংলাদেশের স্টিল শিল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এটি প্রায় সম্পূর্ণভাবে বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে উঠেছে।

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, এক সময় দেশের বড় সরকারি স্টিল মিলগুলো টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। কিন্তু বেসরকারি উদ্যোক্তারা ধারাবাহিক বিনিয়োগের মাধ্যমে শিল্পটিকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছেন। এর ফলে বর্তমানে দেশে নির্মাণে ব্যবহৃত রড আমদানি করতে হয় না।

তাঁর মতে, এই সাফল্যের পরও স্টিল শিল্প পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা পায়নি। বরং প্রতি বছর নতুন নতুন কর ও ভ্যাটের চাপ বাড়ছে। বাজেট প্রণয়নের আগে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা হলেও তাদের প্রস্তাবের যথাযথ প্রতিফলন দেখা যায় না।

শেখ ফজলুর রহমান বকুল বলেন, স্টিল শিল্প অত্যন্ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানিনির্ভর। ফলে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধি সরাসরি উৎপাদন ব্যয়ে প্রভাব ফেলে। কিন্তু একই সময়ে বাজারে চাহিদা কম থাকায় উৎপাদকরা সেই ব্যয় পণ্যের দামে সমন্বয় করতে পারেন না।

তাঁর মতে, সমস্যার আরেকটি কারণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার ধীরগতি। শিল্প খাতের বাস্তবতা সম্পর্কে নীতিনির্ধারকদের আরও সংবেদনশীল হওয়া প্রয়োজন। তিনি মনে করেন, ব্যবসাবান্ধব নীতি ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি গড়ে উঠলে শিল্পের অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব।

তিনি আরও বলেন, নতুন উন্নয়ন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন এবং বন্ধ থাকা প্রকল্পগুলো পুনরায় চালু করা গেলে শুধু স্টিল শিল্প নয়, পুরো অর্থনীতিতেই ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। কারণ নির্মাণ কার্যক্রম বাড়লে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, শিল্প উৎপাদন বাড়বে এবং অর্থনৈতিক কর্মকা-ে গতি ফিরে আসবে।

মোহাম্মদ শাহজাহান: ‘ডিমান্ড সৃষ্টি করতে না পারলে শিল্পগুলো ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়বে’

বাংলাদেশ স্টিল মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব এবং চাকদা স্টিল অ্যান্ড রি-রোলিং মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শাহজাহান বর্তমান সংকটকে মূলত চাহিদা সংকট হিসেবে দেখেন।

তাঁর মতে, স্টিল শিল্পে বিনিয়োগের পরিমাণ অত্যন্ত বেশি। কারখানা স্থাপনের পাশাপাশি উৎপাদন চালিয়ে যেতে বিপুল কর্মপরিধি অর্থায়নের প্রয়োজন হয়। কিন্তু বাজারে পর্যাপ্ত চাহিদা না থাকায় উৎপাদন সক্ষমতা পূর্ণমাত্রায় ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে ইউনিটপ্রতি উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, শিল্পের সামনে দুটি পথ খোলা রয়েছে। একটি হলো উৎপাদন ব্যয় কমানো, অন্যটি হলো বাজারে চাহিদা বৃদ্ধি করা। তবে তাঁর মতে, বর্তমান বাস্তবতায় দ্বিতীয় পথটিই বেশি কার্যকর।

মোহাম্মদ শাহজাহান মনে করেন, সরকারি উন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধি, অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং নির্মাণ খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে চাহিদা তৈরি করা সম্ভব। অর্থনীতির গতি বাড়লে স্টিল, সিমেন্টসহ বিভিন্ন মৌলিক শিল্পের বাজারও সম্প্রসারিত হবে।

তিনি ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদকেও বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, এক অঙ্কের সুদহার নিশ্চিত করা গেলে উদ্যোক্তাদের আর্থিক চাপ অনেকটাই কমে আসবে। একই সঙ্গে নতুন বিনিয়োগও উৎসাহিত হবে।

আগামী পাঁচ বছরে শিল্পের সম্ভাবনা সম্পর্কে তিনি আশাবাদী। তাঁর বিশ্বাস, বর্তমান সংকট সাময়িক। অর্থনৈতিক কর্মকা- স্বাভাবিক হলে এবং সরকারি উন্নয়ন ব্যয় কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের স্টিল শিল্প শুধু অভ্যন্তরীণ চাহিদাই পূরণ করবে না, বরং আরও উচ্চমূল্যের স্টিল পণ্য উৎপাদনের দিকেও এগিয়ে যেতে পারবে।

চারজন শিল্পনেতার বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে-বাংলাদেশের স্টিল শিল্প বর্তমানে কঠিন সময় পার করলেও এর ভিত্তি শক্তিশালী। উৎপাদন সক্ষমতা, উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা নিয়ে তাঁদের মধ্যে আস্থার ঘাটতি নেই। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে নীতিগত সহায়তা, সাশ্রয়ী অর্থায়ন, উন্নয়ন প্রকল্পের গতি বৃদ্ধি এবং বাজারে নতুন চাহিদা সৃষ্টির বিকল্প নেই। কারণ স্টিল শিল্প শুধু একটি ব্যবসায়িক খাত নয়; এটি দেশের শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।

 

আরও পড়ুন

লোড হচ্ছে...